লেখিকা

"আচ্ছা, ভেবে দেখব।" - হাসিমুখে এই কথা বলে মাইক ছাড়লেন নিবেদিতা সেন। খ্যাতনামা লেখিকা নিবেদিতা সেন। আজ এই বিখ্যাত সংস্থা থেকে তাকে সম্বর্ধনা দেবার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে পাঠকদের পক্ষ থেকে একটা অনুরোধ করা হয়েছে, অবশ্য এই অনুরোধ টা প্রথম নয় আগেও অনেক প্রকাশক এই অনুরোধ করেছিলেন। নিবেদিতা আমল দেন নি। অনুরোধ টা ছিল আত্মজীবনী লেখার। আজও সেই একই অনুরোধ। আত্মজীবনী লেখায় বড় অনীহা তার। নিজের জীবন তার একান্তই নিজের। সেটা কে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার ইচ্ছা তার কোনোকালেই নেই। ছোটবেলায় আর পাঁচটা ভাইবোনের সাথে কেটেছিল দিনগুলো। ভালো মন্দয় মিশিয়ে। স্কুল শেষ করে কলেজ। কোথাও বিশাল কিছু করতে না পারলেও মধ্য মেধার নিবেদিতা খুব একটা খারাপ ফল ও করে নি। কলেজ থেকে বেরিয়ে একটা ছোটখাট চাকরি ও পেয়েছিল। তারপর বিয়ে। অনিমেষ ছেলে ভালো, ভালো চাকরি করে। সর্বদা একটা হাসি মুখে লেগেই আছে। বাবা মা র পছন্দ তার নিজে র যে খুব পছন্দ হয়েছিল সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিয়ের পরে ও কোনো অসুবিধা হয় নি। স্বামী তাকে খুব ই ভালোবাসে। কিন্তু নিবেদিতা র মনে একটা কাঁটা বিধে ছিল। বিয়ের দিন নিবেদিতার বন্ধুবান্ধব দের দেখে অনিমেষ খুব একটা খুশি হয় নি। অনিমেষ খুব একটা বন্ধু বান্ধব পছন্দ করতো না। অতএব নিবেদিতা কেও ছাড়তে হলো সে সব। নিবেদিতা সদ্য প্রেমের জোয়ারে ভাসতে শুরু করেছিল। তাই আমল দেয় নি। কিন্তু কোথাও যেন একটা দম আটকে আসতো। তাও জীবন কাটছিলো। অশান্তি শুরু হলো ছোট্ট রাই এর যখন ৩ বছর বয়স। আস্তে আস্তে অনিমেষের ব্যবহার পাল্টাতে শুরু করলো। রোজ ঝগড়া শুরু হলো। কথার মাত্রাই ছিল অনিমেষের যে তুমি ঠিক সংসারী নও। সংসার কে দেখো না। চলে যাও তুমি। নিবেদিতা বুঝতে পারতো না ভুল টা কোথায় ওর। হাজারবার জানতে চাইলেও উত্তর পায় নি কোনোদিন ই। এ সবের মধ্যে রাই ছিল একটা ভরসার জায়গা। ওকে নিয়ে সময় কাটতো নিবেদিতার। হ্যাঁ আরো একটা অভ্যেস ছিল, লেখালিখি করার। মাঝে মাঝে ছোট ম্যাগাজিন বা কাগজে বেরোতো সেগুলো। অনিমেষ কোনোদিন ই উৎসাহ দেয় নি। প্রথম প্রথম নিবেদিতা দেখাতো উৎসাহ নিয়ে, অনিমেষ মুখ বাঁকিয়ে বলতো "সারাদিন বসে বসে তো আর কাজ নেই, এসব ই করো। এসব ছেড়ে একটু সংসার এ মন দিতে পারো তো।" এরপর থেকে নিবেদিতা আর কোনদিন দেখাতে যায় নি। আস্তে আস্তে রাই বড় হতে লাগলো। ছোট স্কুল থেকে বড় স্কুল এ গেল রাই। বাড়তে লাগলো তার ব্যাস্ততা। পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো নিবেদিতার একাকিত্ব, অনিমেষের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব। নিবেদিতার একাকিত্বে এখন সঙ্গী শুধু লেখা। একদিন নিবেদিতার লেখা একটি গল্প নামি সংবাদ পত্রে ছাপা হলো। সঙ্গে এলো কিছু টাকাও। খুব আনন্দের সঙ্গে অনিমেষ আর রাই কে খবর টা দিলো। অনিমেষ স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে বলে উঠলো " আর কি? পুরস্কার ও পাচ্ছো নাকি? বলা যায় না। তা এখন তো আর সাধারণ গৃহবধূ নয়। লেখিকা না সাহিত্যিক কোনটা ঠিক হবে বলতো? ভাবছি nameplate তা পাল্টে দেব। কি বল রাই?? ঠিক আছে না ? " রাই হাসতে হাসতে বললো " বাবা, এরকম করে বলো না। সারাদিন কি করবে বলতো মা। কত আর t. V দেখে সময় কাটাবে। কাজ নেই তাই লেখে। চাকরি করলে তো এত সময় পেত? আছে একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়। চিন্তা নেই। তাই সময় কাটায়।" এত অসহায়, এত অপমানিত আগে কোনোদিন লাগে নি তার। এরপর নিবেদিতা চলে আসে বাবার কাছে। ফিরতে চায় নি আর অনিমেষের কাছে। অবশ্য অনিমেষ ও চায় নি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। বলেছিল "তেজ কমলে চলে আসতে লজ্জা পেয়ো না কিন্তু"। বাবার কাছে বেশিদিন ছিল না নিবেদিতা। এখন লেখার সুবাদে কিছুটা পরিচিতি হয়েছে। টুকটাক কিছু রোজগার হয়। কয়েক মাসের মধ্যে একটা ওয়ার্কিং হোস্টেল এ চলে আসে ও। এরপর শুধুই লেখা। মাঝে একবার রাই এসেছিল। নিবেদিতা তাকে বলেছিল" টাকা পয়সা আসবে যাবে, কিন্তু সম্মান একবার গেলে আর ফিরে আসে না। নিজের সম্মান বজায় রাখতে অন্যকে সম্মান করাটা সব থেকে জরুরি। যেদিন সেটা করতে পারবি সেদিন আমার থেকে খুশি কেউ হবে না। আর সেদিন আমি অবশ্যই তোর কাছে যাবো। " রাই হেসে বলেছিল " তোমার এখনো শিক্ষা হয় নি মা। সেই বই এর বস্তা পচা কথাগুলো বলে যাচ্ছ। নতুন কিছু বল। " " নতুন কিছু বলার নেই আমার। তুমি শান্তিতে থেকো এটাই এখন আমার প্রার্থনা ভগবানের কাছে। অনেক রাত হলো বাড়ি যা রাই" বলে রাই কে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল নিবেদিতা। আর কোনদিন ও বাড়ি থেকে কোনো খবর আসে নি। ভাবতে ভাবতে কখন যে বাড়ি এসে গেছে নিবেদিতা। খেয়াল নেই। দু মাস আগে এই ছোট ফ্ল্যাট তা কিনেছে নিবেদিতা। একজন সর্বক্ষণের লোক রেখেছে। দুজনের বেশ ভালোই কেটে যায়। না আজ রাতে আর কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না। খাবার তুলে রাখতে বলে শোয়ার ঘরের দিকে গেল নিবেদিতা। নাঃ আত্মজীবনী সে লিখবে না। অমৃত হোক আর গরল ই হোক। সে একই পান করবে। কারোর অধিকার নেই সেটা জানার।

===========================================================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.