- আমাদের বাড়ির উঠোনের দক্ষিণ দিকের কোনে একটা শিউলি গাছ ছিল । ঘন বর্ষার শেষে হঠাৎ একদিন সকালবেলা গাছটার নীচে শিউলি ফুল ঝরে থাকতে দেখে বুঝতাম শরৎকাল এসে গেছে । সকালবেলায় দূর্বাঘাসের উপর শিশির পড়তো আর সূর্যের আলোয় রূপালী বিকিরণ ছড়াতো । পুকুরের জলটা হঠাৎ খুব পরিষ্কার হয়ে যেত ম‍্যাজিকের মতো । শালুক ফুল ফুটে উঠতো মাথা ছাড়িয়ে। তাদের পদ্মফুলের মতো পাতা ভেসে থাকতো জলের উপর ‌। হঠাৎ করে বিকেল হয়ে যেত । মেঘেরা ছড়িয়ে যেতে আকাশের এদিক ওদিক । পেঁজা তুলোর মতো তারা উড়ে বেড়াতো । আর তাদের গায়ে রং মাখিয়ে দিতো ঢলে পড়া সূর্য । কি যে ভালো লাগতো । তোর এসব মনে পড়ে দীপ্ত ?

- মনে পড়ে তো । অনু, তোর ক্লাশ নাইনের কথা মনে আছে এখনো ?

- সব কিছু মনে নেই, তবে বেশ কিছু ঘটনা আজও মনে আছে । এখন যখন একদম একা হয়ে যাই, ঠিক তখন সব মনে পড়ে । গায়ে কাঁটা দেয় । মন খারাপ করে । আবার ভাবতে খুব ভালোও লাগে । ওসব কথাগুলো বোধহয় ভুলতে পারবো না কোনদিন ।

- কোন ঘটনা গুলো ?

- ওই যে, যেগুলো বাড়ির কাউকে বলা যেত না । তখন একমাত্র বিন্দুই জানতো । আসলে কি জানিস, সুখের কথা কাউকে না বললে ঠিক সুখটা উপলব্ধি করা যায় না । আর বিন্দু খুব চাপা মেয়ে ছিল , কাউকে কিছু বলতো না । শুধু আমার কথাগুলো শুনতো আর আমার খুশি দেখে ও খুব আনন্দ পেত ।

- অতো চাপা বলেই প্রেম টেম করতে পারলো না । গোটা দু বছরে আমার সঙ্গে একটাই কথা বলেছিল ।

- কি কথা ?

- সরস্বতী পূজার খিচুড়ি খাওয়ার পর হাত ধুয়ে বেরনোর মুখে একটা সাদা খাম দিয়ে বলেছিল, দীপ্ত, এটা অনু দিয়েছে। বলেই এক ছুট ।

- মনে পড়ছে, চিঠিটা কাকে দিতে হবে সেকথা আর বলেনি তোকে ।

- আমিই তোর নিষিদ্ধ চিঠিটা পড়ে ফেলেছিলাম ।

- হাসবি না একদম, গাঁট্টা মারবো হাঁদা কোথাকার ।

- আমি আর এখন হাঁদা নেই রে ।

- তখন তো ছিলিস । নইলে সব কিছু পড়ার পর কেউ চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে ?

- ওটা তো রাগ করে ছিঁড়ে ফেলেছিলাম । আমরা চাইতাম তোর সঙ্গে অপুর রিলেশনটা হোক।

- ওটা আর এক, সারাজীবন ধরে বলতেই পারলো না ।

- তুই জানতিস, ও তোকে খুব পছন্দ করতো ?

- কি করে জানবো ? সব কটা হাঁদারামের দল যদি মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে, কে জানবে বাবুদের মনের কথা ?

- ভালোই হয়েছে একদিক থেকে । বিয়ে করে তারপর যদি ঝগড়া করতিস।

- সব প্রেমের বিয়েতে বুঝি ঝগড়াই হয় ? তাহলে প্রিয়াঙ্কা আর পীযূষকে কি বলবি ? দীপুর কথা বল, কি সুন্দর বোঝাপড়া দুজনের ।

- তা করছে বটে । তবে কি জানিস মনের সঙ্গে মনের মিল হওয়াটাই আসল । দীপুর প্রথম ক্ষেত্রে যেটা হয় নি মনে হয় । ওরা একে অপরকে খুব ভালোবাসতে চেয়েছিল, কিন্তু কোথায় যেন যোজন ফাঁক রয়ে গেছিল। তাই ওই বিচ্ছেদ। পরেরটা দুজনেই ডুবন্ত মানুষ । তাই আঁকড়ে ধরেছে পরস্পরকে । টিকে গেছে তাই । আর প্রিয়াঙ্কার ব‍্যাপারটা ঠিক জানি না । হয়তো সেই প্রেমটা আছে অথবা আর সব কাপলদের মতো ভালোবাসার​ একটা অভ্যাস ।

- ভালোবাসা অভ‍্যাস হয় নাকি ? ভালোবাসা মানে তো যাকে ভালোবাসি তার ভালোতে বাস করা । সে যাতে ভালো থাকে তাতেই আমার ভালো । তার ভালোটাও আমার ভালো লাগে, খারাপটাও ভালো লাগে – তার সবটা নিয়েই আমার ভালো থাকা। বিন্দুকে দেখ, কোনদিন প্রেম টেম করে নি , তবু কি সুন্দর করে সংসার করছে ।

- বিন্দুর মধ‍্যে এক বুক ভালোবাসা ছিলো তো । ওর ও মনে একটা ছবি ছিল যাকে নিয়ে ওর সংসার । ওর মনের ছবির সঙ্গে ওই মানুষটার একদম মিল আছে । তাই বিন্দু ওর সবকিছু দিয়েই ওকে ভালোবাসে । আমার তো তাই মনে হয়।

- কি জানি হয়তো তুই ঠিক বলেছিস​ । বিন্দু বলতো ওই ছেলেটার এটা ভালো না , তার সেটা ভালো না , কিন্তু ওই গুণটা অসাধারণ, ঐ ছেলেটা বড্ড গায়ে পড়া । গায়ে পড়া ছেলে দেখলে খুব রেগে যেত । তোকে ওই চিঠিটা দিয়ে এসে আমার কাছে কেঁদে ফেলেছিল । যাকে দেওয়ার কথা তার নামটা বলতে ভুলে গেছে বলে । আর কি অদ্ভুত দ‍্যাখ ওই চিঠি আর দুবার লিখতে পারি নি । আর বলা হয় নি কোনদিন ।

- আজও মনে পড়ে তাকে ?

- না, মনে পড়ে না । কারণ পরে জেনে গিয়েছিলাম ও আমারই এক বন্ধুর সঙ্গে.. ... তার চেয়ে একজনের কথা বেশিই মনে পড়ে ।

- কার ? অপুর ?

- জেনে কি করবি ? তার চেয়ে তোর কথা বল শুনি ।

- বলবি না তো ? ঠিক আছে বলিস না । অন্তরের কথা অন্তরেই থাকুক । এখন ব‍্যর্থতার জন্য কোন ক্ষোভ নেই। অভিমান সময়ের স্রোতে ভেসে গেছে । না পাওয়া গুলো খুঁজে যাই যা আছে নাগালের মধ্যে । তাকে যত পেতে চাই তত যায় সে দূরে বহুদূরে, ধরা দেয় না বলেই তাকেই ছুঁতে চাই । “নয়ন সমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ তাই ঠাঁই ।“ ফুরাবে না তুমি ফুরাবো না আমি । সে রবে নীরবে অন্তরে মম। এই আমি ।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.