অজানা বন্ধু


" এই, ওঠ...ওঠ..." কিচিরমিচির করতে করতে একঝাঁক রঙিন পাখী ঘুম ভাঙ্গালো আমার। হাত ধরে বিছানা থেকে টেনে তুললো আমায় পাখীরা...আমার বন্ধুরা, " ফুল তুলতে যাবি না! " লাফিয়ে উঠে বিছানা ছাড়লাম। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে বাঁশের সাজি হাতে ওদের সাথে বেরিয়ে পড়লাম। তখন ভোর সাড়ে চারটা। আবছায়া আলো আঁধারে ঘেরা চারিদিক। বেলা হলে অন্যেরা সব ফুল তুলে নেবে আর আমরা কিছুই পাবো না।

এবার এত ভোরে ফুল তুলতে যাওয়ার কারণটা বলি। পুরুলিয়াতে ভাদ্রমাসে " ভাদুপূজো" বলে একটা উৎসব হয়। অল্পবয়সী সব মেয়েরা মিলে এই পূজো করে। প্রচলিত কাহিনী আছে যে, কাশীপুরের (পুরুলিয়াতে) পঞ্চকোটরাজের কন্যা ভদ্রেশ্বরীর বিয়ের দিন বরযাত্রীরা রাস্তায় ডাকাতের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং বরের মৃত্যু ঘটে। মৃতদেহ কাশীপুরে আনা হয় এবং কন্যা সহমৃতা হন। রাজা আদরিণী কন্যার স্মৃতি রক্ষার জন্য মন্দির বানিয়ে কন্যার মূর্তি স্থাপিত করেন। কন্যার জন্মমাস ভাদ্রমাসে সম্পূর্ণ মাস ধরে লক্ষ্মীরূপে তাঁর পূজো করা হয়। প্রজারাও তাদের প্রিয় রাজার দুঃখে অংশীদার হয়। সেই থেকে এখনও পর্য্যন্ত গ্রামে গ্রামে এই পূজোর রেওয়াজ চলে আসছে। আমরাও ছোটবেলায় ভাদ্রমাসের এক তারিখ থেকে রোজ সকালে ফুল তুলে পূজোর ব্যবস্থা করতাম। সন্ধ্যেবেলা একসাথে জুটে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বসে "ভাদুর" গান গাইতাম। মাসের শেষের দিন মুর্তি কিনে এনে পূজো করে সমস্ত রাত্রি জেগে গান গাওয়া হত আর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হত, সকালে বিসর্জন। এই পূজোটি ভিন্ন ভিন্ন পাড়ার মেয়েদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার রূপ নিত। খুব মজা হত।

এবার ফুল তুলতে যাওয়ার কথায় আসি। আমাদের গ্রামের থেকে একটু দূরে মাঠের শেষে ছিল এক আশ্রম। সেখানে ছিল হরেকরকমের প্রচুর ফুলের গাছ। একপাশে একটি বড় পুকুর আর একপাশে ধানের ক্ষেত... মধ্যে চওড়া রাস্তা দিয়ে আশ্রম যেতে হত। আমরা গল্প করতে করতে চলেছি। আমি আর আমার প্রিয় বান্ধবী সরস্বতী কথা বলতে বলতে একটু এগিয়ে গেছি। হঠাৎ চিৎকার করে " স্নিগ্ধা... আ...আ..." বলে আমার হাত ধরে টেনে পিছিয়ে গেল সরস্বতী। আমি ঘাবড়ে গিয়ে ওর দিকে তাকাতেই ও কিছু না বলে সামনের দিকে আঙ্গুল তুলে ধরলো। দেখি এক বিরাট সাপ ফনা তুলে সামনে খাড়া হয়ে আছে। ভয়ে বুকের ভেতর হিম হয়ে গেল। আর একটু হলেই আমার পা তার ওপর পড়তো। পেছনের বন্ধুরা হৈ হৈ করে এগিয়ে আসাতে সাপটা সড়সড় করে রাস্তা পার হয়ে নিজের গন্তব্যে চলে গেল। কিছুক্ষণের জন্য আমরা সবাই ভয়ে স্থির হয়ে গেলাম...বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটানোর আওয়াজ। শিগগির স্বাভাবিক হয়ে আবার হাঁটতে লাগলাম। পুকুর পার হলে মাঠ। তার একপাশে এক আমবাগান আর অন্যদিকে একটু দূরে আশ্রম। বাগানের দিকে নজর পড়ায় দেখি তিনটি মেয়ে... আমাদেরই বয়সী আশ্রমের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমরা একটু অবাক হলাম যে ওই দিক থেকে ফুল তুলতে আবার কারা এলো! এবার আমরা তাড়াতাড়ি পা চালালাম...নয়তো ওরা সব ভালো ভালো ফুল তুলে নেবে।

আমরা আশ্রমে ফুল তুলতে তুলতে সবাই আলাদা আলাদা হয়ে গেলাম। একটা বড় ফুলগাছের ওপর দেখি একটি মেয়ে ফুল তুলছে। ফুল অনেক উঁচুতে...পাতলা ডালের ওপর চড়ে মেয়েটি ফুল তুলছে...মুখ দেখা যাচ্ছে না। আমার কোন বন্ধুই হবে। আমি নীচে দাঁড়িয়ে বললাম, " বেশী করে ফুল তুলে নীচে ফেল, আমি কুড়িয়ে নিচ্ছি।" ও কিছু না বলে ফেলতে লাগলো আর আমি সাজি ভরতে লাগলাম। " আর দরকার নেই...সাজি ভরে গেছে ", বলে মুখ তুলে দেখি কেউ কোত্থাও নেই। একটু ভয় পেলাম... তখনও দিনের আলো ফোটে নি। তাড়াতাড়ি বাকী বন্ধুদের ডাকাডাকি করে একসাথে হলাম। সকলেরই সাজি ভর্ত্তি ফুলে। সকলেই আমার মত সাহায়্য পেয়েছে। কিন্তু কেউই সেই অচেনা বন্ধুদের মুখ দেখতে পায় নি ! আমরা সকলে মিলে অনেক খুঁজলাম তাদেরকে, কিন্তু কোন পাত্তা পেলাম না।

ততক্ষণে দেখি আশ্রমের মহারাজজী প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরছেন। আমরা তাঁকে প্রণাম করলাম। ধীরেধীরে সূর্য্যদেবের লালিমায় পূর্বদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। আমরা বাড়ীর দিকে পা বাড়ালাম মনে সংশয় নিয়ে... কে ছিল এই অজানা বন্ধুরা !

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.