নিশি রাতে প্লুটোর প্রভু


সিটি গ্রুপের পাঁচ কোটি টাকার শপিং মলের ডিজাইন তৈরির কাজ শুরু করবার চিঠি এবং তার সাথে অগ্রিম বাবদ মোটা টাকার চেক পাবার আনন্দে, অন্য দিনের মত আমি সামনের গেট দিয়ে না গিয়ে, পেছনের গেট দিয়ে আমার নীল বোলেরোতে লাল মোরামের রাস্তাটা ধরলাম। সেই সামান্য ভুল এখন আমাকে কানা গলিতে পেতে রাখা মাকড়সার জালে এনে ফেলল।

এই ভুলটা তখন ইচ্ছে করেই ঠিক করি নি বাড়ি ফেরবার তাড়ায়। এই রাস্তায় অনেক সংক্ষেপে হাইওয়েতে আসা যায়, এছাড়া রাস্তাটা সরু আর কাঁচা বলে গাড়ির ভিড় অনেক কম।

প্রধান নিকাসি নালার ওপর একটা সংকীর্ণ সেতুকে চওড়া করবার সরকারি অনুমোদনের জটে আটকে গিয়ে এই বাইপাস এখন কাঁচা রাস্তা হয়েই থমকে আছে অনেক দিন ধরে।

একটা ঝাঁ চকচকে নতুন মডেলের ভি-ডব্লিউ খুব বিশ্রী ভাবে কেউ পার্ক করেছে ঠিক সেতুটার মুখের কাছে । শুধু তাই নয়, গাড়িতেও কেউ নেই বলেই মনে হয়। একে পাশ কাটিয়ে যাওয়া বেশ মুস্কিলের কাজ।

টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে, বেশ অন্ধকার এখন বাইরে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ি থেকে বেরোতে হল, ডাইনে বাঁয়ে কতটা কাটাতে হবে সেটা বোঝবার জন্য।

টিপ টিপ বৃষ্টির হাত থেকে মাথা বাঁচাতে আমার প্রিয় স্ত্রাইপড গলফ ক্যাপ আর চার ব্যাটারির ফ্ল্যাশ লাইটটা সঙ্গে রাখলাম।

ভি-ডব্লিউটাকে কাটাবার রাস্তা দেখার জন্য ব্রিজের রেলিংয়ের ধারে আলো ফেলতেই সেতুর ওপরই একটু দূরে এক পাটি দামি কোলাপুরি চপ্পল আর একটা নামি ব্রান্ডের ব্রিফকেসের হাতল নজরে এল।

কিন্তু এই নির্জন সেতুতে পর পর এই দুটো জিনিষ কিছু একটা ব্যাপার নয়ত?

চারদিকটা ফ্ল্যাশ লাইটের আলোতে পরিত্যক্ত গাড়ি মালিকের আর একবার ব্যর্থ অনুসন্ধান সেরে নিজের গাড়ির কাছে এসে দরজা খুলতে যাচ্ছি, এমন সময় মনে হল আমার কানের কাছে কেউ যেন একবার জোরে হাততালি দিল।

খেলোয়াড় হবার সুবাদে আমার চটজলদি প্রতিক্রিয়া সাধারনের থেকে অনেক বেশি। আমি বিদ্যুৎ গতিতে ঘাড় ঘোরাবার আগেই একটা মোক্ষম রদ্দা পড়ল আমার মেরুদণ্ডে, আর সেইসাথে কেউ কিছু একটা দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আমার হাঁটুতে মারল।

মাটিতে গড়িয়ে যাবার আগে মনে হল আমার শার্টটা রক্তে ভিজে যাচ্ছে, একটা তীব্র যন্ত্রণা আমার মেরুদণ্ড থেকে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। দু’চোখে যেন কালো কালির স্রোত নেমে এল।

জ্ঞান আসতে বুঝলাম আমি নিজের বোলেরোর সামনের সিটে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছি। অনেক চেষ্টার পর কোনও রকমে হাতড়ে হাতড়ে গ্লোভ কম্পারটমেন্ত থেকে যন্ত্রণানাশক স্প্রে খুজে নিয়ে কোনও রকমে মেরুদণ্ডের যতটা সম্ভব কাছে স্প্রে করলাম।

ওষুধটা কিন্তু দারুন কাজ করল, যন্ত্রণা অনেকটা চলে গেল। আমি এখন গাড়ি চালাতে পারব মনে হল। এই ভয়ঙ্কর জায়গাটা থেকে পালাতে পারলে বাঁচি।

এঞ্জিন চালু করার সময় দেখি গুণ্ডারা গাড়িটা চালিয়ে সেতু পার করে অন্য পারে রেখেছে। আমার মোবাইল, দামি ঘড়ি, হীরের আংটি কিছুই নেয় নি। শুধু গলফ ক্যাপটা নেই।

আমার গাড়িটা হাইওয়ের মোড়ে আসতেই সিগনাল লাল হয়ে গেল এবং সেই সাথে পুরো ব্যাপারটা মনে ভেসে উঠল।

যদি আমি রোজই এই নির্জন লাল মোরামের রাস্তাটা দিয়ে প্রায়ই বা রোজই যাওয়া আসা করতাম তাহলে এটা হতেই পারত যে কেউ আমাকে মারবার জন্য গুন্ডা ভাড়া করেছে।

কিন্তু পরিত্যক্ত ভি ডব্লিউটা, এক পাটি দামি কোলাপুরি চপ্পল, দামি ব্রিফকেসের হাতল অন্য কিছুর ইঙ্গিত যেন করছে কিন্তু ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

কাছে কোথায় যেন কুকুরের কুই কুই শুনলাম। আওয়াজটা আর একবার কানে আসতেই মাথা একটু পেছন দিকে ঘুরিয়ে চোখ নামিয়ে দেখি দিব্যি সুন্দর দেখতে রেশমি কালো রঙের এক স্পানিয়েল গাড়ির পেছনের সিটের তলায় কুঁকড়ে বসে আছে।

আমি সাহস করে একটা হাল্কা হুইসিল দিলাম, কুকুরটা লাফ দিয়ে আমার পাশে এসে বসতেই সিগনাল হলুদ হল। রাস্তায় যেতে মাঝে মাঝে কুকুরটাকে দেখছিলাম।

এর গলায় দামি বেল্ট, পিঠে দামী সিল্কের কভার আর প্রাকৃতিক কাজকর্মের জন্য লেজের তলাতে ব্যাগ এ সব বুঝিয়ে দিচ্ছে যে এর মালিক কোনও রহিস লোক। বোঝা যাচ্ছে না এই কুকুর কি ভাবে এল আমার গাড়িতে।

ওর নাম দিলাম প্লুটো। কিন্তু নামটা ওর খুব একটা পছন্দ হল না। প্লুটো বলে ডাকতেই দেখি “গর..গর” করে উঠল। আবাসনের গ্যারাজে গাড়ী রেখে বেরিয়ে আসা মাত্র প্লূটো লাফিয়ে আমার কোলে চলে এল । আমাকে ভরসা করা যায় ও সেটা বুঝে নিয়েছে।

কোথা থেকে যেন পারফিউমের গন্ধ আসছে। আশে-পাশে কেউ কি মেখেছে নাকি? একটু এ দিক ওদিক ঘাড় ঘোরাচ্ছি, এই অবসরে জোর একটা ঝটকার সাথে প্লুটো আমার কোল থেকে ঝাঁপিয়ে দৌড় মারল গ্যারাজের দিকে। আমাকে ছুটতে দেখে সিকিউরিটির লোকটিও দৌড়ে এল ।

ততক্ষণে প্লুটো আমার গাড়ির পিছনের দরজা আঁচড়াচ্ছে। ওদিকের দরজা খুলে দিতেই ও লাফিয়ে মুহূর্তের মধ্যে একটা কোলাপুরি চপ্পল মুখে কামড়ে বেরিয়ে এসেই আমার আগে আগে চলতে থাকল।

প্লুটোর মুখে কামড়ে রাখা এই একপাটি চপ্পলটা একটু আগে ব্রিজের রেলিংয়ের ধারে পড়ে থাকা একপাটি কোলাপুরি চপ্পলটার জুড়িদার নয়তো?

ফ্লাটে ঢুকতেই, প্লুটো বেশ সপ্রতিভতার সাথে পুরোটা ঘুরে নিয়ে লিভিং রুমে সোফা আর ডিভানের মাঝে দেওয়ালের কোণটা পছন্দ করল। একটা কম্বলের টুকরো ডিভানের তলায় রাখা ছিল, পা দিয়ে সেটা টেনে তার ওপর জমিয়ে বসল।

ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস কোল্ড ড্রিঙ্ক নিলাম, যন্ত্রণা কমাবার আর একটা ওষুধ এর সাথে গলা দিয়ে নামাতেই স্বস্তি ফিরে এল। খেয়াল হল প্লুটো বাবুকে কিছু দেওয়া হয় নি।

একটা প্লেট এ বিস্কুট আর বড় কাপে জল ওর সামনে নিয়ে রাখতেই সেই মিষ্টি গন্ধটা আবার টের পেলাম। এটা তো মনে হয় হাসপাতালে অজ্ঞান করবার জন্য দেয়। প্লুটোর মুখের কাছে একটা কালশিটে পড়ার মত দাগ দেখলাম।

আমি এবার নিশ্চিত হলাম আমার গাড়িতে ফেলার আগে একে মারধর করা তো হয়েছেই, এমন কি কাপুরুষ গুণ্ডারা শেষতক এর মুখ বন্ধ করার জন্য ইথার দিয়ে একে অজ্ঞানও করেছে । এখনও ইথারের সেই গন্ধটা সামান্য হলেও রয়ে গেছে।

ব্রিজের ঘটনাটা আবার ঘুরে ফিরে মনে চলেই এল। ভেবেছিলাম ঘরে এসে সোজা চান ঘরে বাথটবে গা ডুবিয়ে গান শুনবো এখন আর সে ইচ্ছেটা করছে না।

ফ্রিজ থেকে মসলা মাখানো চিকেন বার করে এয়ার ফ্রায়ারে মুচমুচে ভেজে একটা প্লেটে নিয়ে এলাম।

কি ভেবে, এক টুকরো চিকেন, প্লুটো হুজুরকে এগিয়ে দিতেই, ও বিরক্ত হয়ে ঘেউ ঘেউ করে উঠে দাঁড়াল আর তার কারনটাও আমার বুঝতে দেরি হল না।

যে কম্বলটা ও নিজেই জোগাড় করে সোফা আর ডিভানের দেওয়াল কোনে শুয়েছিল, সেই কম্বলের তলাতেই সেই একপাটি কোলাপুরি চপ্পলটা রেখেছে। আমার আর কোনও সন্দেহ রইল না যে ওই একপাটি চপ্পলটা ওর প্রভুর আর ও সেটা পরম যত্নে পাহারা দিচ্ছে। আমি মাংসের টুকরোর লোভ দেখিয়ে চপ্পলটা হাতাবার ফন্দি করছি এই সন্দেহে ও এত বিরক্ত হল।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.