ঘরণীর অতৃপ্ত বাসনা



 এ এস এম শুভজিত সান্যাল বীরভুম জেলার বাতাস পুর রেল স্টেশনে বদলী হয়ে এসেছে।ধু ধু মাঠের মধ্যে রেল কোয়ার্টার।বিদ্যুৎ আছে, ভোল্টেজ কম থাকায় রাতে প্রদীপের মতো আলো জ্বলে । দুরে অজ গ্রাম। চারদিন হল বাতাস পুর স্টেশনে কাজে যোগ দিয়েছে। খালাসী পাশোয়ান ওর কোয়ার্টারে আসবাব ঢুকানোর সময় বলেছিল -" ছোটবাবু এই কোয়ার্টারের দোষ আছে।আওরত রুহু ঘুরে বেড়ায়।" কথার মানে শুভজিত বুঝতে পারেনি।কয়েকদিন থাকার পর বেলুড়ের শ্বশুর বাড়ী থেকে নববিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে আসবে। কোয়ার্টারে দুটি ঘর ও বারান্দা, উঠোন সংলগ্ন রান্না ঘর বাথরুম পায়খানা আছে।ও তিনদিন লাস্ট নাইট অর্থাৎ রাত বারোটা থেকে ডিউটি করেছে।আজ দিনে ডিউটি করে শুভজিত প্রথম রাতে ভিতরের ঘরে পালঙ্কে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল। ও লাইট নিভিয়ে অন্ধকারে করে শোয়।বন্ধ দরজার বাইরে রান্নাঘরে শব্দ হচ্ছে। হয়ত বিড়াল এসেছে। কিন্তু একটানা হাতা খুন্তি নাড়ার আওয়াজে রাত বারোটায় ওর ঘুম ভাঙল। মনে হচ্ছে কেউ যেন রান্না ঘরে কাজ করছে।বাথরুমে জল ফেলার শব্দ শুনে ভয়ে আড়ষ্ট হল। -"বোস এখনই খাবার আনছি।" অস্পষ্ট মহিলার কন্ঠ কানে যেতেই শুভজিত উঠে কম্পমান হাতে দেওয়ালের সুইচ টিপে আলো জ্বালল।ও ভুতে বিশ্বাস করে না।কিন্তু একা ঘরে কৃষ্ঞপক্ষের রাতে এরকম শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি।ও দরজার ছিটকিনি খুলে বাইরের রান্না ঘর বাথরুমে ঢুকে কোন মহিলাকে দেখতে পেল না। রান্না ঘরে ওভেন ও গ্যাসের সিলিন্ডার এনেছে। এখন দুপুরে ও রাতের রান্না খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে পাশের কোয়ার্টারে অবিবাহিত এ এস এম হালদারের রান্না ঘরে।পোর্র্টার রাধে শ্যাম পাশোয়ান রান্না করে দেয়: স্ত্রীকে আনলে রান্নাঘর ব্যবহার করবে। ঘরের কয়েকটা বাসন জায়গা মতোই আছে। বাসনের শব্দ কে করল? উঠোনের পাঁচিলের বাইরে নিম গাছের ডালে একটা হুতোম প্যাচা বসে অন্ধকারে উজ্বল ডাগর চোখে চেয়ে আছে।দরজা বন্ধ করে শুভজিত বিছানায় শোয়। বাইরে রান্না ঘরে আবার হাড়ি গ্লাস বাটি রাখার শব্দ শুরু হল। ও ভাবে অশরীরী কেউ থাকলে সেতো রান্না ঘরে। ঘরে না এলেই হল।ওর কাণে এল ধপাস শব্দে উঠোন কেউ যেন পড়ে গেল। -" মাগো" বলে নারী কন্ঠের আর্তনাদ শুনে ও ভয় কাটাতে দুকানে বালিশ চেপে ধরল। কাণ বন্ধ রেখে ভয় দুঃশ্চিন্তার প্রহর কাটাল। শেষ রাতে আওয়াজ বন্ধ হলে ঘুমাল। সকালে শুভজিত পাশের কোয়ার্টারের অবিবাহিত জুনিয়ার এ এস এম হালদারবাবুকে বলল-" হালদার আমার কোয়র্টারের রান্না ঘর উঠোন থেকে রাতে নানারকম শব্দ হচ্ছে।মহিলা কন্ঠের আর্তনাদ শুনলাম।ঘরটাতে ভুত পেতনী আছে নাকি?" উদ্বিগ্ন হয়ে হালদার বলল-" তোমাকে আগে বলা হয়নি। তিন বছর আগে ঐ কোয়ার্টারে বোসদা বউ নিয়ে উঠেছিল। বোসদার স্ত্রী যখন নয় মাসের অন্তসত্বা ছিল তখন বাথরুমে স্নান করার সময় পা পিছলে পড়ে যায়; বোসদা স্ত্রীকে সিউরি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল; মর্মান্তিক ঘটনায় স্ত্রী ও গর্ভের সন্তান দুজনাই মারা গেছে। বোসদা ভালবেসে বৌদিকে বিয়ে করেছিল। ওরা ছিল মেড ফর ইচ আদার। একবছর শোকে দুঃখে স্ত্রীর স্মৃতি নিয়ে কোয়ার্টারে ছিল। পরে বোসদা বদলী হয়ে চলে গেছে।তারপর থেকে রাতে ঐ কোয়ার্টারে কেউ থাকতে পারে না।"--" শুনেছি প্রণব বোস এখন ভেদিয়ায় পোস্টিং নিয়ে আছে। কয়েকদিন আগে হাওড়া ডি এস অফিসে বোসদার সাথে দেখা হয়েছিল।"--' হ্যাঁ, বোসদা মনের দুঃখে বদলী নিয়ে ভেদিয়ায় চলে গেছে। তবে বছর ঘুরতেই আর একটা বিয়ে করেছে।শুনেছি ডিভোর্সী মহিলাকে রেজিস্ট্রী বিয়ে করেছে। এ এস এম কোয়ার্টার এখানেতো দুটো। স্টেশন মাস্টার পরিবার নিয়ে আছে।তুমি কেবিনম্যানের কোয়ার্টারে থাকো।"-সাহস সঞ্চয় করে শুভজিত বলল-" না আমি এখানেই থাকব।" স্ত্রী শহরের মেয়ে মোনালিসাকে অশরীরীর কথা বলা যাবে না।তাহলে আসবেই না। পরের রাতেও বাসনের আওয়াজ এবং রান্না ঘর উঠোনময় পদশব্দ শুনতে পেল। তবে কোন মহিলা কন্ঠ শোনেনি।হয়তো ছায়া ঘরণী নিজেকে প্রকাশ করেনি। দুই দিন পরে শুভজিত স্ত্রী মোনালিসাকে বাতাসপুরে নিয়ে এসেছে।ও ইচ্ছা করে ফার্স্ট নাইট অর্থাৎ বিকাল চারটে থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত ডিউটি নিয়েছে।রাতে সাথে থাকলে মোনালিসা ছায়া ঘরণীর শব্দ শুনে ভয় পাবে না।রাত বারোটায় ঘরে এসে দেখে মোনালিসা কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে আছে।--" কিগো তুমি না ঘুমিয়ে বারান্দায় কেন?--" মোনালিসা আতঙ্কে শুভজিতকে জড়িয়ে বলল-" রান্না ঘরে কে যেন আছে। বন্ধ ঘরে রান্না করার শব্দ পাচ্ছি। আমার ভয় করছে। এই কোয়ার্টারে আমি তোমাকে ছাড়া একা রাতে থাকতে পারব না।" শুভজিত স্ত্রীকে সাহস দিতে বলল-" ও সব তোমার মনের ভুল।ঘরে শোবে চলো।" মোনালিসা রাতের খাবার স্টেশনে পাঠিয়ে দিয়েছিল।আলো নিভিয়ে ওরা বিছানায় শুয়ে পড়ল। শুভজিত স্ত্রীকে আলিঙ্গন করে বুকে রাখল। মোনালিসা স্বামীর বুকে মাথা রাখতেই বন্ধ দরজার বাইরে উঠোনে জল পড়ার সঙ্গে ধপাস শব্দ হল। "মাগো" বলে মহিলার আর্তনাদ।মোনালিসা ভয়ে শিউরে উঠল। শুভজিত উঠে টর্চ হাতে ওকে নিয়ে এসে উঠোনে রান্না ঘরে খুঁজে কাউকে পেল না। ফিরে আসার সময় গ্যাসের ওভেনের সামনে লাল শাড়ী পরা এক মহিলাকে খুন্তি হাতে দেখে --" ও কে দাঁড়িয়ে আছে?" বলে মোনালিসা ভয়ে স্বামীর বুকে মুখ লুকাল।অথচ শুভজিত কিছু দেখতে পেল না।স্ত্রীর ভয় দুর করতে টর্চের আলো রান্নাঘরে ফেলে দেখালো। এবার মোনালিসা কিছু না দেখতে পেলেও বলল-" বিশ্বাস কর একটু আগে পরিষ্কার দেখেছি একটা লাল শাড়ী পরা মহিলা দাঁড়িয়ে ছিল।"--" অন্ধকারে কোন ছায়া দেখে ভয় পেয়েছ।আমিতো আছি কোন ভয় নেই।" শুভজিত ভৌতিক ঘটনায় ভয় পেলেও স্ত্রীর মনে সাহস দিচ্ছে। ওরা এসে বাহুবন্ধনে পালঙ্কের শয্যায় শুয়ে কাণ সজাগ রাখে।আর কোন আওয়াজ হল না ওরা চিন্তা মুক্ত হয়ে ঘুমোল। রাধে পাশোয়ান বাজার করে দেয়; কাজের মহিলা মোনালিসাকে সাহায্য করে।মোনালিসা ওদের রাতের রান্না ঘরের ভুতুরে ঘটনার কথা বললে ওরা কি যেন বলতে গিয়েও চেপে যায়; দুপুরে স্টেশন মাস্টারের বাড়ী বেড়াতে গিয়েছিল। ওনার স্ত্রী মোনালিসাকে বলেছে - একজন এ এস এমের অন্তসত্বা স্ত্রী ঐ কোয়ার্টের বাথরুমে স্নান করার সময় পিছলে পড়ে গর্ভপাত হয়ে মারা গেছে।ওর প্রেতাত্মা ঘরে আছে।তোমরা কোয়ার্টার পাল্টাও।" কথা শুনে মোনালিসা স্বামীকে বলল-" তুমি যদি কোয়ার্টার না পাল্টাও আমি বেলুড়ের বাড়ীতে চলে যাব।" বিকাল চারটেয় ডিউটি যাওয়ার আগে শুভজিত বলল-" তাহলে কেবিন ম্যানের কোয়ার্টারে যেতে হয়; ঘরএ ছোট। ঘরের উঠোনে টিউওয়েল পাবে না। রাতেতো আমি থাকছি ভয় কিসের।" রাত বারোটায় কোয়ার্টারে ফিরে দেখে স্ত্রী আলো জ্বেলে সামনের বারান্দায় বসে। রাতে ভয়ে ঘরে থাকতে পারছে না।ওরা রাতের খাবার খেয়ে শুতে গেল। শয্যায় শুভজিত স্ত্রীকে ধরে আদর করার সময় মোনালিসা আতঙ্কে চীৎকার করল-" ঐ দেখ সেই বউটা তোমার পিছনে শুয়ে আমাকে দেখছে!" শুভজিত শয্যা থেকে নেমে আলো জ্বালাতে গিয়ে দেখল লোডশেডিং হয়েছে। টর্চের আলোয় পালঙ্কটা দেখে বলল-" কেউ তোমায় দেখছে না।ভয় পেয়ো না" মোনালিসা বলল-" আমি বাথরুমে যাব, আমার সঙ্গে চলো।" দরজা খুলে ওরা উঠোনে নামল।মোনালিসা টর্চ হাতে বাথরুমে ঢুকল।মুহুর্তে দেখল লাল শাড়ী পরা এক তরুণী চীৎ হয়ে পড়ে আছে।শাড়ী মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। -" বাবাগো কি রক্ত! সেই বউটা মরে পড়ে আছে।" বাথরুমের দরজা খুলে মোনালিসা অজ্ঞান হয়ে স্বামীর দেহে ঢলে পড়ল।শুভজিত কিছু দেখতে পেল না।স্ত্রীকে বিছানায় এনে শোওয়াল।শরৎকালের শেষ রাতে টিউবওয়েলের শীতল জল এনে মোনালিসার মুখে চোখে দিয়ে জ্ঞান ফেরাল।মোনালিসা এতোটাই ভয় পেয়েছিল যে পরের দিন শুভজিতকে বলল-" তুমি কোয়ার্টার না পাল্টালে একটা রাতও আমি থাকব না।" শুভজিতের কোন কথা বা অনুরোধ না শুনে শিক্ষিতা মোনালিসা দুপুরের ট্রেনে বেলুড়ে চলে গেল।শুভজিত ডিউটি করে রাত বারোটার পর ঘরে জেগে বসে আছে। মোনালিসা মোবাইল ফোনে পৌঁছানোর সংবাদ দিয়ে সাফ জানিয়েছে ঘর পাল্টে আমায় নিয়ে যাবে।। শুভজিত রাতে সেই অশরীরী মহিলার দেখা পেতে চায়।ও বলবে আমরা তোমার কি ক্ষতি করেছি!? কেন আমার বউকে ঘর ছাড়া করলে।মাঠে নিশুথী রাতে শেয়াল কুকুর ডাকছে। ও আলো নিভিয়ে টেবিলে মোমবাতি জ্বেলে চেয়ারে বসে। পিছনের দরজা খোলা ঘরে যেন অদৃশ্য মহিলা চলা ফেরা করছে।কাঁচের চুড়ির শব্দ হচ্ছে। রাত সাড়ে বারোটায় নিম গাছে কাকেরা ডাকছে। উঠোন পেরিয়ে ধোঁয়াশা মাখা লাল শাড়ী পরা এক তরুণী ধীর পায়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।শুভজিতের দেহের রক্ত যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে। জেদের বশে বিদেহীর দেখা পেতে চাইছিল। কিন্তু এখন ভয়ে কুঁকরে গেছে।গলায় স্বর নেই। তরুণী চাপা গলায় বলল-" ভয় নেই, দাদা আমার একটা উপকার করবে?" তার বেদনার্ত কন্ঠ শুনে শুভজিত একটু সাহস ভরে বলল-" আমার বউকে ভয় দেখিয়ে ঘরে থাকতে দিলে না, আর আমি তোমার উপকার করব?--" কয়েকদিন পরেইতো তোমার স্ত্রীকে পাবে।আমি যে চিরকালের জন্য জীবন সাথীকে হারিয়েছি।ঘর সংসার করতে পারলাম না। কোন সাধ পুর্ণ হল না।আমার কত কষ্ট জানো?"--" তারজন্য আমি কি করব?" কাতর কন্ঠে ছায়া ঘরণী বলল-" পরশুদিন আমার মৃত্যুর দু বছর পুর্ণ হবে।গত বছর এই ঘরে তোমার পরিচিত বোসদা আমার ফটোয় রজনী গন্ধার মালা পরিয়ে স্মরণ করেছিল।এবার নতুন বউ পেয়ে নতুন জায়গায় গিয়ে আমাকে ভুলে গেছে।তুমি আমার কথা মনে করিয়ে পরশু রাতে এই ঘরে ওকে নিয়েআসতে পারবে?" -" আমার কথায় ও আসবে কেন!" অশরীরী মহিলা আবছা হয়ে হাহাকার করল" তুমি মনে করালে ওকে ঠিক এখানে আসতে হবে। ও আমাকে ভুলে থাকতে পারবে না।" কথাটা ঘরের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হল। ছায়া রমণী অদৃশ্য হওয়ার পরে শুভজিত ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারল না।ভোরে পুর্ব আকাশে আলো ফূটলে ঘুমাল। পরের দিন বিকালে ডিউটিতে গিয়ে শুভজিত ভেদিয়া স্টেশনে কর্মরত সিনিয়ার এ এস এম প্রণব বোসের সাথে ফোনে কথা বলল। ও তার ছেড়ে যাওয়া কোয়ার্টারে আছে শুনে বোসদা বলল-" ঐ কোয়ার্টারে তোমার অসুবিধা হচ্ছে নাতো? শুনেছি আমি চলে আসার পর রাতে ঐ কোয়ার্টারে ভয়ে কেউ থাকতে পারে না। ওখানে আমার জীবনের বড় করুণ দুর্ঘটনা ঘটেছে।আমার প্রেগন্যান্ট স্ত্রী পড়ে মারা গেছে।" শুভজিত ফোনে বলল-" আপনিতো তার পরে ঐ ঘরে ভালই ছিলেন?" -" আমি ওর স্মৃতি নিয়ে সব ভুলে ছিলাম।" শুভজিত কথা প্রসঙ্গে বোসদাকে বলে ফেলল-" বোসদা আগামীকাল আপনার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু দিবস।গত বছর দিনটা বাতাসপুর কোয়ার্টারে স্মরণ করেছিলেন।" বোসদা বলল-" তোমাকে একথা কে জানাল?"--" পরিচিতের মুখে শুনলাম। এবার কি ভেদিয়াতেই মৃত স্ত্রীকে স্মরণ করবেন?" -" দেখি কি করা যায়,ওর জন্য মনটা কেমন করছে --।" উদাস কন্ঠে আরো কিছু বলার জন্য বোসদা ফোনটা ধরেছিল। শুভজিত ফোনটা রেখে ট্রেনের লাইন ক্লীয়ার দিতে ব্যস্ত হল। ডিউটি করে রাতে কোয়ার্টারে রাধেশ্যাম পাশোয়ানের তৈরী রুটি তরকারী খেয়ে পালঙ্কে শুয়ে শুভজিত ভয়ে শিহরণ বোধ করছে; সন্ধ্যায় ঝড় বৃষ্টি হওয়াতে এখনও লোডশেডিং চলছে। অন্ধকার ঘরে কোন শব্দ হচ্ছে না। সেই রহস্যময়ী ছায়া রমণী এসে যদি বলে- তুমি আমার উপকার করেছ? ভয় পেলেও ও ঠিক করে বলবে-" আমি বোসদাকে তোমার মৃত্যুর দিন মনে করিয়ে দিয়েছি।" ওর কর্ম ক্লান্ত দু চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল।শেষ রাতে উত্তরের খোলা জানালার আবছা আলোয় দেখল- লাল ঝলমলে বেনারসী শাড়ী পরা ছায়া রমণী ওর পালঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে; তার গলায় রজনীগন্ধার মালা।একি দেখছি তার পাশে সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরা বোসদা।ওর গলাতেও রজনীগন্ধার মালা; কপালে চন্দনের ফোঁটা।বোসদা বলল-" শুভজিত তোমার কথায় সাড়া দিয়ে স্ত্রীর মৃত্যুর দিনে এখানে এসেছি।" ছায়া স্ত্রী দু হাত বাড়িয়ে বোসদাকে ডাকল; তার বাহু বন্ধনে এসে বোসদা জ্ঞান হারাল।ছায়া স্ত্রী ওকে যত্নে বিছানায় শুইয় দিল। শুভজিত আশঙ্কায় বলল-" একি করলে! বোসদা অজ্ঞান হয়ে গেছে।" শান্ত সমাহিত গলায় অশরীরী ঘরণী বলল-"তোমার বোসদা মারা গেছে; আমি স্বামীকে নিয়ে দুরে চলে যাব।দাদা তুমি আমায় মুক্ত করেছ। আমার সাথীকে কাছে এনে দেওয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।এবার তোমরা ঘরে থাকতে পাররে।" বোসদার শরীর থেকে কুয়াশাঘন বায়বীয় অংশ বেরিয়ে ছায়া ঘরণীর কাছে গেল।ওরা অদৃশ্য হল।শুভজিতের মনে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ।বোসদার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে। তার বর্তমান স্ত্রীকে কি জবাব দেবে? মানসিক যন্ত্রনায় ঘুম ভাঙল।এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল! ওর ঘরে যা ঘটতে দেখল তা সত্যি নয় জেনে শান্তি পাচ্ছে। বোসদার স্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হবে না। সকাল হয়ে সুর্য্য উঠে গেছে। শয্যা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিল। সামনের ঘরে আসতেই বারান্দায় লোকের কলরব শুনল। দরজা খুলে দেখে বারান্দায় উঠার তিন ধাপ সিঁড়ি ঘিরে লোকের জটলা। কাছে গিয়ে দেখে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পরা বোসদা সিড়িতে পড়ে আছে। তার কাঁধে সুতীর ব্যাগে রজনী গন্ধা ফুলের তোড়া।ডান হাতের মুঠোতে ধরা রজনী গন্ধার মালা।শুভজিত হাত দিয়ে বুঝল বোসদার দেহ ঠান্ডা। চিন্তিত এ এস এম হালদার বলল-" অদ্ভুত লাগছে এত ভোরে বোসদা ফুলের মালা নিয়ে বাতাসপুরের পুরনো কোয়ার্টারে এল কেন? আর বারান্দায় এসেই অসুস্থ হল! মনে হচ্ছে বোসদা মারা গেছে। আমি ডাক্তারকে ডেকে পাঠিয়েছি।" শুভজিত বিস্ময়ে ও উৎকন্ঠায় বলল-" আজ বোসদার স্ত্রীর মৃত্যু দিন। আমি ঘুমোচ্ছিলাম, কিছুই জানিনা।" ওরা ধরাধরি করে প্রণব বোসকে বারান্দায় শুইয়ে দিল। হালদার বলল -" আমি এইমাত্র কন্ট্রোল ফোনে ভেদিয়ার কোয়ার্টারে বোসদার স্ত্রীকে খবরটা জানালাম।" --" শুনে বোসদার স্ত্রী কি বললেন? শুভজিতের ব্যাকুল প্রশ্নে হালদার বলল-" শুনে ওর স্ত্রী কাঁদছে। শেষ রাতে কখন বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেছে ওনার স্ত্রী কিছুই জানে না।" এক রেল কর্মী বলল-" আমি ভোরে আপের ফার্স্ট ট্রেনে বোসবাবুকে নামতে দেখে অবাক হয়েছিলাম।আমার ডাকে সাড়া না দিয়ে উনি ঘোরের মধ্যে কোয়ার্টারের দিকে গেলেন।" ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন-" ও হৃদ রোগে মারা গেছে। কোন মানসিক আঘাতে হার্ট ফেল করেছে।" এ এস এম হালদার বলল-" দু বছর আগে বোসদার প্রেগন্যান্ট স্ত্রী মানে বৌদি ভোর বেলায় কোয়ার্টারের বাথরুমে পা পিছলে পড়ে মারা গিয়েছিল!" রাতের স্বপ্নটা মনে পড়ায় শুভজিত উত্তেজনায় শিহরিত হল। ওর দীর্ঘশ্বাস পড়ল, কোয়ার্টার ছেড়ে দিলেই ভাল হ'ত।কিন্তু ভবিতব্য কি আটকানো যেত? 


==============================


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.