"চুপি"তে চুপিচুপি




সুচন্দ্রা যেদিন পাপান কে নিয়ে -আমার বাড়ি ছেড়ে চিরদিনের মত চলে গেল সেদিন বেশ খানিকটা হাল্কা লেগেছিল।কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই এক মরুভূমির ধু ধু শূন্যতা আমাকে গ্রাস করল।মনে হত আমার ফাঁকা ফ্ল্যাট টা  আমাকে যেন গিলে খেতে আসছে।আমার কেমন যেন অস্থির লাগতো।কষ্ট আর হতাশা ভোলবার জন্য শুরু করলাম ড্রিংকিং।
আমি-ডঃ অর্কদীপ বসু- কোলকাতার একজন ব্যাস্ত শিশু চিকিৎক-আমার স্ত্রী কে কিছুতেই বোঝাতে পারিনি যে আমি আমার ডাক্তারি পেশা র সাফল্য টা কে ছাড়া,নিজেকে ছাড়া- আসলে কাউকেই কখনও ভালবাসিনি।আমি বোঝাতে পারিনি- যে বান্ধবী দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার জন্য আমার সঙ্গে ওর অশান্তি,যাদের কে নিয়ে আমাকে তুমুল সন্দেহ-তাদের একজনের প্রতি ও আমার বিন্দুমাত্র কোনো আকর্ষন নেই।আমার এই দুর্দান্ত হ্যান্ডসাম চেহারা আর ডাক্তারি পেশাটার জন্য মেয়েরা যখন আমাকে আঁকড়ে ধরতে চায় তখন আমি ওদের চোখ দিয়ে নিজেকে একটু জরিপ করে নিই মাত্র।আমার ইগো টা স্যাটিসফায়েড হয়।এই অতি সুক্ষ ব্যাপার টা সুচন্দ্রা কিছুতেই বুঝতে পারলো না।
আমার জীবনের এই ভয়ঙ্কর শৈত্য যখন আমাকে গ্রাস করে ফেলেছে,আমি ক্রমশ চলে যাচ্ছি এক গাঢ় তমসায়-ঠিক তখনই আমার জীবনে আসে সায়নী।
সায়নী কাজ করে একটা অতি ছোটখাট ফার্মা কোম্পানি তে।সে একজন বিক্রয় প্রতিনিধি।আমি সাধারনত বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ভাল ওষুধ ছাড়া প্রেসক্রাইব করিনা।কিন্তু এই মেয়েটির নাছোড় চেষ্টা,আন্তরিকতা,নিষ্ঠা এবং সর্বোপরি ঐ সাপের মত হিলহিলে সুঠাম শরীর আর সেইসঙ্গে ঐ খুনে দৃষ্টি যা আমার অন্তরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত একেবারে কাঁপিয়ে দিত-আমাকে বাধ্য করল ওর প্রতি আকৃষ্ঠ হতে।সেই সময় আমার দরকার ছিল একটু উষ্ণতা,আর ওর প্রয়োজন ছিল একটা প্রফেশনাল সাপোর্ট।আমরা দুজন দুজনের হাত ধরেছিলাম।
একসময় বন্ধুত্বের সীমানা পেরিয়ে যখন আরো কাছাকাছি আসার সময় এলো তখন  বিবাহিতা সায়নীর কোথায় যেন একটা সঙ্কোচ ছিল।কিন্তু যে মেয়ে একবার আমার স্পর্শ পেয়েছে সে আর কতদিন নিজেকে সরিয়ে রাখবে!

জানুয়ারি র প্রথম সপ্তাহ।কোলকাতায় এই কটা দিনই যা একটু ঠান্ডা পড়ে।এ কদিন নতুন নার্সিংহোম টাকে নিয়ে এত ভয়ঙ্কর কাজের প্রেসারে ছিলাম তা বলার নয়।এখন শরীর চাইছে বিশ্রাম।মন চাইছে আরাম।অন্তত দুটো দিন আমাকে কোলকাতার বাইরে কাটাতেই হবে।
অনেক ভেবেচিন্তে ফোন করলাম আমার বন্ধু অয়ন কে।অয়ন ব্যাটা সারা বছর এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায় আর সেগুলো নিয়ে ভ্রমন কাহিনি লেখে।
-হ্যাঁ রে অয়ন- দিন দুয়েকের জন্য একটা ট্যুরিষ্ট স্পট বলতে পারিস।একটু নিরিবিলি।কোলকাতার কাছাকাছি।
-অর্কদা তুমি পূর্বস্থলি চলে যাও।জায়গাটা বর্ধমানে।তুমি ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে কাটোয়া লোকাল ধরো।সকালের ট্রেন ধরবে।ঐ সময় ফাঁকা থাকে।ঘন্টা তিনেক লাগবে।নামবে পূর্বস্থলি।পুর্বস্থলি নেমে দেখবে অনেক ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে।বলবে-"চুপি" তে যাব।সামান্য ভাড়া নেবে।পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে দেবে।ওখানে রয়েছে সঞ্জয়।যে ওখানকার বাংলোর কেয়ারটেকার।আমি বলে দিচ্ছি।ও তোমার জন্য একটা ঘর বুক করে রেখে দেবে।
একাই যাচ্ছো নাকি?
-না সঙ্গে এক বন্ধু ও যাচ্ছে।কিন্তু ওখানে আছেটা কি?
-পুর্বস্থলির এই 'চুপি' গ্রাম টার সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা।আর এই শীতকালে ওই গ্রামের জলাশয়ে ভিড় করে পরিযায়ি পাখির দল।সুদুর সাইবেরিয়া থেকে দলে দলে পরিযায়ি পাখি এই সময় হাজির হয় পূর্বস্থলি তে।সে এক দেখার মতো দৃশ্য অর্ক দা।ঘুরে এসো।

আমার ইচ্ছা ছিল দু রাত থাকার।কিন্তু সায়নী রেসিডেন্সিয়াল কনফারেন্সের নাম করে মাত্র একটা রাত ওর বরের কাছে ম্যানেজ করতে পারায়- ঐ একরাত ই ঠিক হল।
ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লাম ব্যান্ডেলের উদ্দেশ্যে।ব্যান্ডেল থেকে ফাঁকা ফাঁকা কাটোয়া লোকাল ধরে দুপুর বারোটা র মধ্যে পৌঁছে গেলাম পূর্বস্থলি।সেখান থেকে মেঠো পথ ধরে ভ্যানে করে আমরা চুপিচুপি এগিয়ে চললাম 'চুপির' দিকে।চারিদিকে শুধুই সবুজের সমারোহ।শীতের দুপুরে সূর্য অকৃপন হাতে তার আলো বিকিরন করছে।
সায়নী আনন্দে গেয়ে উঠলো-'আহা মিষ্টি,দেখো মিষ্টি,কি ই মিষ্টি এ সকাল'।
এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভাসতে ভাসতে বাংলোর সামনে এসে দাঁড়ালাম।

 

 

কেয়ারটেকার ছেলেটি হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো।বেশ সুন্দর সাজানো গোছানো ঘর।ব্যালকনি থেকে দেখা যাচ্ছে অনেক দুর।এই জায়গাটার খোঁজ খুব বেশি লোক জানেনা।জায়গাটি ভয়ঙ্কর রকমের নির্জন।আমি ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম।থ্যাঙ্কস অয়ন।
উথলে ওঠা আলোয় ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম।একটানা ডেকে চলেছে একটা ঘুঘু পাখি।দুরে এক গ্রাম্য বৃদ্ধা দেওয়ালে ঘুঁটে দিচ্ছেন।চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ।জিন্স আর জ্যাকেটে সায়নী কে লাগছে ঠিক অল্প বয়সের টিনা মুনিমের মতন।আমি পিছন থেকে সায়নী কে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলাম ওর ঘাড়ে,গলায়,কানের লতিতে।
সায়নী আমাকে বাঁধা দিয়ে বলল-'তুমি বড্ড শরীর ঘেঁষা'।
উত্তরে আমি ফিসফিস করে বললাম-
"বয়স যতই বাড়তে থাকে-বয়স ততই খসে পড়ে/ শরীর আগে স্পর্শ করো-প্রেমের কথা পরে"।
তাড়াতাড়ি চলে এলাম গঙ্গার তীরে।আদিগন্ত বিস্তৃত গঙ্গা।গঙ্গার জল থেকেই তৈরি হয়েছে এক জলাশয়।সেখানে ভেসে এবং উড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য পরিযায়ি পাখি।এরা কেউ এসেছে সুদুর সাইবেরিয়া থেকে,কেউ এসেছে ভূমধ্য সাগর থেকে।কেউ এসেছে ইউরোপ বা আমেরিকা মহাদেশ থেকে।সায়নী নিয়ে এসেছে সেলিম আলি,র লেখা বিখ্যাত বই-'বার্ডস'।সে বই দেখে দেখে আমাকে চেনাতে লাগলো বিভিন্ন পাখি।
ঐ দেখো পেরেগ্রিন ফ্যালকন।ঐ অপূর্ব পাখিটার নাম লেসার হুইসলিং ডাকস।ঐটা ইউরেসিয়ান ওয়াইগন।কোনটা স্পুনবিলস।এখানে নাকি একশো প্রজাতির পাখি আসে।
এছাড়াও এখানে নাকি ভিড় জমায় বিভিন্ন ধরনের মাছরাঙা।এখানকার প্রকৃতিকে নানান রঙে রাঙিয়ে দেয় এশিয়ান ওপেনবিল,ব্ল্যাক হুডেড ওরিওল,রেড হুইস্কার্ড বুলবুল,ওরিয়েন্টাল ম্যাগপাই রবিন রা।কত দুর দুর দেশ থেকে কত হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে ওরা ঠিক পথ চিনে হাজির হয় এই 'চুপি'গ্রামে,আমাদের দেশে।আবার শীত শেষ হলে ওরা ঠিক ফিরে যাবে ওদের নিজেদের দেশে।কি অবিশ্বাস্য উঁচু মানের ট্রাভেলার এরা!নৌকা করে এগিয়ে যেতে লাগলাম আরো ভিতরে।ওরা নিজেদের মত জলকেলি করছে।ওদের ও নিজস্ব একটা ভাষা আছে।আমি চেষ্টা করছিলাম সেই ভাষাকে বোঝার।আমার মাথায় অদ্ভুত একটা ভাবনা এলো।
আজ সারা পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়েছে যুদ্ধ।চলছে একের পর এক বোমা বর্ষন।এই বিষাক্ত বোমার ধোঁয়ায় যদি এই পরিযায়ি পাখিরা মারা যায়!যদি ওরা পাগল হয়ে যায়!তাহলে তো আর ওরা পথ চিনে আমাদের দেশে আসতে পারবেনা!

আমাদের নৌকা এগিয়ে চলেছে গঙ্গার আরো ভিতরে।দুরে দেখা যাচ্ছে মায়াপুরের ইস্কন মন্দির।ওপাশটা নদীয়া জেলা।
কি করে যে দুঘন্টা কেটে গেল বুঝলাম ও না।এদিকে পশ্চিমাকাশে তখন রঙের হোলিখেলা শুরু হয়েছে।সারা আকাশ হয়ে আছে লালে লাল।সমস্ত গঙ্গা যেন রক্তস্নাত।এক দঙ্গল পাখি নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে ঘরে ফিরে গেলো।

রাত অনেক হল।খোলা জানলা দিয়ে আমাদের দিকে একদৃষ্টে নির্লজ্জ ভাবে তাকিয়ে আছে একফালি চাঁদের কাস্তে।বিছানায় সায়নীর ছাব্বিশের উপর আমার বেয়াল্লিশ।এইরকম এক চুড়ান্ত আবেগঘন মুহূর্তে সায়নীর বরের ফোন আসে।মোবাইলটা বড় অশ্লীল ভাবে বেজে ওঠে।আমাকে এক ঝটকায় দুরে সরিয়ে সে মোবাইল হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।কেন কে জানে-মুড টা অফ হয়ে যায়।
পরদিন অন্ধকার থাকতে থাকতে আমার ঘুম ভেঙে যায়।সায়নী তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে।ওকে আর জাগাই না।একা একাই বেরিয়ে আসি।প্রবল শীতের মধ্যে গঙ্গার তীরে এসে বসি।শিশুর সারল্য নিয়ে হাল্কা কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে বসে রয়েছে প্রকৃতি।আপনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে অপূর্ব সব বিদেশী পাখি রা।গঙ্গার জলে হাত ছুঁইয়ে থাকতে থাকতে আমি যেন হঠাৎ ই ঐ পরিযায়ি পাখি দের মধ্যে নিজেকে দেখতে পেলাম।ওরা প্রবল শৈত্যের মধ্যে বাঁচতে না পেরে, উষ্ণতার খোঁজে হাজির হয়েছে এখানে।আবার ওরা ফিরে যাবে ওদের স্থায়ী আস্তানায়।আমিও সামান্য একটু উষ্ণতার খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটে চলেছি।কিন্তু আমার স্থায়ী আস্তানায় আমাকে ফিরতেই হবে।আমাকে ফিরতেই হবে সুচন্দ্রার কাছে।আমাকে ফিরতেই হবে পাপানের কাছে।যেভাবেই হোক-আমাকে ফিরতেই হবে।

পূব আকাশ লাল হয়ে উঠছে।জলজ পাখিরা মেতে উঠেছে কলকাকলি তে।আকাশে হঠাৎ ই একঝাঁক পাখি মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।ছলাৎছল শব্দে তীরে এসে ধাক্কা মারছে ছোটছোট ঢেউ।পাড়ে দাঁড় করানো বৃদ্ধ নৌকাটা ঢেউ এর ধাক্কায় দুলে উঠছে।হঠাৎই একটা পানকৌড়ি মুখ তুলে আমায় দেখে গেল।আকাশে তখন শুরু হয়েছে আলোর অভিষেক।অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে পৃথিবীতে শুরু হচ্ছে একটা নতুন দিন।


(এই গল্পের সমস্ত চরিত্রই কাল্পনিক।কেউ যদি কারো সাথে কোনো মিল খুঁজে পান তা নিতান্তই কাকতালিও ও দুর্ভাগ্যজনক।ছবি গুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত)।
 

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2015-2016 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.