জন্মান্তর


অচেনা দ্বীপের মতন এক স্টেশনে এসে ট্রেনটা দ্বিতীয়বারের জন্য থেমে গেল। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে নলিনী জনমানবশূন্য ঐ স্টেশনে সাহসভরে নেমে পড়ল। আজ সকাল থেকে সে কোনকিছুই রুটিন-মাফিক করছিল না। তার দেখার ইচ্ছা ছিল যে কলের সুতোর বাঁধাধরা জীবনধারণের বাইরে বেড়োলে কি হয়! হাল্কা আলো-আঁধারে ঘিরে-থাকা এক নির্জন নির্জীব স্টেশনে একাকী এক অসমসাহসী তনয়া অপেক্ষা করতেই থাকল নিয়তির সাথে পাঞ্জা কষবার জন্য।

♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥

ট্রেনের একটানা দুলুনিতে একটা ঝিমঝিম ঘুমের ভাব আসে, তাই বোধহয় সকল জনপ্রাণি ঘুমে আচ্ছন্ন--------ঘুম নেই শুধুমাত্র নলিনীর সজল কালো চোখে-------ট্রেনের জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্যপট যেমন চলমান ছবির মতন সরে সরে যায়, তেমনি তার মনের ভেতরে পুরানো ঘটনাস্রোত আন্দোলন জাগাচ্ছিল।


ষোড়শী নলিনীর সঙ্গে সুনীলের প্রথম আলাপ এক Common friend সোমার মারফত। তাও আবার সোমা প্রথম থেকেই সুনীলকে Like করতো। সুনীলকে পরীক্ষা করবার জন্যে সোমা নলিনীকে দিয়ে সুনীলকে ফোন করায়----নলিনীকে বানায় ওর কাল্পনিক বাল্যপ্রেমিকা! হায় রে নিয়তি! অজানা অচেনা সুনীলের সাথে প্রথমবারে যেবার দেখা হয় নলিনীর সেবার অন্ধকারে কেউ কারো মুখ দেখেনি। কিন্তু নিয়তিই সোমার সাহায্যে আবার দ্বিতীয়বার ওদের মিলিয়ে দিল। নলিনী ভাবল অচেনা দ্বীপের মতন এক স্টেশনে এসে ট্রেনটা দ্বিতীয়বারের জন্য থেমে না গেলে হয়তো তার জীবনটা অন্যধারায় বইত।


কিন্তু সব নদী যেমন সাগরে গিয়ে পড়তে পারেনা, তেমনি সুনীল-নলিনীর প্রেম পরিণতি পাওয়ার আগেই হঠাৎ করেই নলিনীকে একা করে ওর বাবা এ জগৎ থেকে চিরতরে চলে গেলেন। নলিনী সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে হারিয়ে খরকুটোর মতন ভেসে যাওয়ার আগে যার হাতটা শক্তভাবে ধরতে চেয়েছিল-----সেই সুনীল হঠাৎ করেই ডাক্তারী পড়তে সুদূর বাঙ্গালোর পাড়ি দিল। নিয়তির এই অদ্ভূত পরিহাসে নলিনীর নিজেকে কলের সুতোয় বাঁধা পুতুল মনে হয়----যার কোনো Control ওর হাতে নেই।


♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥


একটি জীবনের গতেবাঁধা গণ্ডীর মধ্যে থেকে কি সকল ইচ্ছারা ডানা খুলে উড়তে পারে ? Maths এর Student নলিনী ভেবে দেখল Probability খুব কম।


চলমান নদীর যাত্রাপথে বাধা পড়লে তখন সে দিক পরিবর্তন করে-----নলিনীর সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির অবর্তমানে ওর উপর মধ্যবিত্ত পরিবারকে চালানোর তাগিদেই চাপ এল বিয়ে করে নেবার জন্য। নিজেকে চাপমুক্ত করতেই স্বাধীনচেতা নলিনী টিউশনী করতে লাগল নিজের Honours এর পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য।


কিন্তু দিনরাত বাড়ীতে একই নাটকের কীর্তন করতে করতে একদিন নলিনী হাঁপিয়ে উঠল। ওদিকে সুনীলকে হোস্টেলে ফোন করে তক্ষুণি ফিরে আসতে বলল নলিনী! এই নিয়ে কথা কাটাকাটিও হয়ে গেল সুনীলের সাথে! তার উপর বাড়ীতেও বিয়ে নিয়ে আবার মার সঙ্গে ঝামেলা হলে জাহান্নুমে যাওয়ার জন্য বেড়িয়ে পরে সে! সে কি তবে জানত সুনীল আর আসবে না!


♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥


ভোরের আলোয় অজানা অচেনা স্টেশনটিকে ভালো করে মাপল নলিনী। সামান্য একটা স্টেশন মাস্টারের ঘর ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। বাইরে যেতেই দেখল যে একটা ছোটখাট দেহাতি পাহাড়ী গ্রাম। সে এই ভেবে খুশি হচ্ছিল যে ঐখানে নিয়তি তাকে আনতে পারিনি, সে স্বেচ্ছায় এসেছে।


কিন্তু গ্রামের লোকজন নলিনীকে কেমনযেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখছে! কেন ? কেমনযেন গুজ গুজ ফিসফিস করছে সবাই! একজন বয়স্ক টাঙ্গাওয়ালা কেবল সাহস করে এগিয়ে এল-----মনে হচ্ছিল নলিনী যেন ওর কতদিনের পরিচিত-----চলিয়ে মালকিন! আপকো হাভেলী লেকে চলে! ওর ভাষায় কি সম্মোহিনী শক্তি ছিল কে জানে----বাধ্য মেয়ের মতন নলিনী টাঙ্গায় উঠে বসল।


পাহাড়ী পথে আঁকাবাঁকা ঢাল বেয়ে গাড়ী এগিয়ে চলে। রাস্তাঘাট কেমনযেন নলিনীর চেনাশোনা!কোথায় দেখেছে মনে পড়ছেনা! হাভেলীতে ওকে নামিয়ে দিয়ে টাঙ্গাওয়ালা চলে যায়।


পুরাতন দিনের অনেক স্মৃতিবিজরিত ঐতিহাসিক বিশাল হাভেলী-----কিন্তু একি! নলিনী সম্মোহিনীর মতন ভেতরে ঢুকে সিড়িঁ দিয়ে দোতলায় উঠে যায়----যেন ঐ হাভেলী ওর জন্যই অপেক্ষায় ছিল যুগ যুগ ধরে----এ যেন নলিনীর নিজেরই শয়নকক্ষ----কিন্তু জীর্ণশীর্ণ দেওয়ালে ঐ ছবিটি কার ? নলিনীর ঘোর কেটে যায়-----ছবিটা তো তারই মনে হচ্ছে! এতো অলংকার পরিহিত রাজরাজেশ্বরীর বেশে সে কি করছে ?


♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥


হা হা হা হো হো হো


নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতাকে এ কোন অশুভ অট্টহাসি চিরে দিল ? পুরানা হাভেলীর পাথরে-পাথরে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে তার রেশ। নলিনীর দেহের সমস্ত লোমকূপ খাড়া হয়ে যায় এক অজানা অদ্ভুতুরে আশঙ্কায়! হঠাৎ আসা হেমন্তের হিমেল হাওয়ায় শিরশির করে কাঁপতে থাকে সে। চলার শক্তিও যেন হারিয়ে ছিল সে ঘটনার আকস্মিকতায়।


অচেনা দ্বীপের মতন এক স্টেশনে এসে ট্রেনটা দ্বিতীয়বারের জন্য থামলে নলিনী জনমানবশূন্য ঐ স্টেশনে সাহসভরে নেমে পড়েছিল এই ভেবে যে---- সে নিয়তির পুতুলনাচের পুতুল নয়! কিন্তু পুরাতন দিনের অনেক স্মৃতিবিজরিত ঐতিহাসিক বিশাল হাভেলীতে এসে তার অলংকার পরিহিত রাজরাজেশ্বরীর বেশে ছবি দেখে সে হতচকিত হয়ে পড়ল! তবে কি তার এখানে আসা পূর্বনির্ধারিতই ছিল? নিয়তি তার সাথে একি খেল খেলছে?


মূর্খ মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভবিতব্যও পাল্টাতে যায়----কিন্তু ভবিতব্য পাল্টানো যায় কি?


♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥


হঠাৎ করে এ কার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে নলিনী ? নাকি সবই তার মনের ভুল! চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক সাথ দিচ্ছিল না! সম্মোহিনীর সম্মোহন কাটাবার কোন শক্তি তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিলনা। -----ঐ ঐযে----- আবার সেই শব্দ----কেউ যেন কষ্টসহকারে পা দুটিকে টানতে টানতে ঘসটাতে ঘসটাতে সিঁড়ি দিয়ে আসছে----ঐ ভৌতিক পরিবেশে আর উত্তেজনা সহ্য করতে পারল না সে! হঠাৎ করেই চোখে অন্ধকার দেখল সে---মাথাটা ঘুরে পড়ে গেল সে----


♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥


“ ওঁ হ্রীঁ হ্রীঁ হূঁ হূঁ ক্রীঁ ক্রীঁ ক্রীঁ

ক্রীঁ ক্রীঁ ক্রীঁ হূঁ হ্রীঁ ক্রীঁ ক্রীঁ ক্রীঁ হূঁ হ্রীঁ স্বাহা,

ঐঁ নমঃ ক্রীঁ ঐঁ নমঃ ক্রীঁ কালিকায়ৈ স্বাহা। ”


গভীর রাতে শ্মশানে লকলকে লেলিহান শিখাকে কে বেষ্টন করে, শবদেহ সামনে রেখে তাণ্ডব নেত্য করছেন ভীষণাকারা অতিকায় কিছু মানুষ। টকটকে লালবর্ণের শালু পরিধেয়, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। মৃতদেহ, হাড়, মানুষের করোটি, বানরের করোটি নিয়ে তাদের কাজকারবার। মদ চুর হয়ে আগুনের ধারে খুলি আর হাড় হাতে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে তান্ডব নেত্য করেন তারা। আর হ্রিং, ব্রিং করে বিকট চীত্কারে মন্ত্র আউড়ে চলেন। তার পর চলে শবসাধনা, ভীষণা দর্শণা, কুরূপা কালী মুর্তির সামনে শব রেখে নাগাড়ে মন্ত্র আর হুঙ্কার চলে সেই ভোররাত পর্যন্ত।রোজরাতে আকাশের চন্দ্রস্খলিত জ্যোৎস্নাকে মন্ত্রসিদ্ধ কুয়াশায় ঢেকে রাখে অমাবস্যার মাতৃভক্ত নন্দী-ভৃঙ্গীরা!


হঠাত্‍ করেই ঘুম ভেঙে যায় নলিনীর---- সে যে এই স্বপ্নটা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে ! এর অর্থ কী ? শুধু গল্পের শেষভাগ কেমনযেন কুয়াশাচ্ছন্ন কুহেলিকাময়---------প্রতিবার ক্লাইম্যাক্স এ পৌছনোর আগেই তার ঘুম ভেঙে যায় !


♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥ ♥


bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2015-2016 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.