উপনয়ন


 

জমিদারী প্রথা অনেকদিন আগেই বিলুপ্ত হলেও চৌধুরীদের তিনশ’ বছরের বিশাল বাড়িটা আজও মাথা তুলে অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষ বহণ করছে। বংশানুক্রমে শরিকের সংখ্যা বেড়েছে, তার সাথে বেড়েছে বাড়ির বাসিন্দার সংখ্যা ও ছোট ছোট ঘরের সংখ্যা।  যদিও অন্যের সুবিধা-অসুবিধার দিকে লক্ষ্য রাখা তো দুরের কথা, কেউ কারো খোঁজও রাখেন না। অতিবৃদ্ধ, বৃদ্ধ, প্রৌঢ়, যুবক, কিশোর ও শিশু মিলিয়ে চার পুরুষের বাস। আয়োজনে খামতি দেখা দিলেও এখনও সাবেকী ঐতিহ্য রক্ষার্থে বাড়ির জীর্ণ শিবমন্দিরে প্রতি সোমবার পুরোহিত এসে দায়সারা পূজা করে যান। রুটিন মাফিক এক এক মাসে এক-একজন শরিকের ওপর শিবলিঙ্গ পূজার ভার পড়ে। অন্য শরিকরা সেই মাসে শিবের বা পুরোহিতের সুবিধা অসুবিধার ব্যাপারে কোন খোঁজখবর রাখেন না। রাখার প্রয়োজনও বোধ করেন না। তবে এখন পর্যন্ত প্রতিবছর পুরাতন ঐতিহ্য মেনে, বাড়িতে দূর্গাপূজা হয়। পূজার চার-পাঁচটা দিন বাড়ির সবাই কোন মন্ত্রবলে কে জানে, একে অপরের সাথে রক্তের টান অনুভব করেন, একত্রিত হয়ে পূজার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।  

দরিদ্র পূজারী ব্রাহ্মণ, সাতকড়ি চক্রবর্তী এই বাড়ির সব পূজা করেন। সবাই জানে এই চক্কোত্তী বামুনের বিদ্যে চালকলা পর্যন্ত। তবু তিনিই এই বাড়ির কুলপুরোহিত, কারণ কথিত আছে সাতকড়ি চক্রবর্তীর অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ, এককড়ি চক্রবর্তীর আমল থেকে বংশানুক্রমে তাঁরাই এই বাড়ির পূজাপার্বন, জন্ম, মৃত্যু, উপনয়ন, বিবাহের কাজ, দায়িত্ব নিয়ে সুসম্পন্ন করে আসছেন। আমার উপনয়নও এই চক্কোত্তী বামুনই দিয়েছিলেন। অবশ্য এই হত দরিদ্র ব্রাহ্মণটিকে দিয়ে পূজা বা অন্যান্য কাজ করানোর পিছনে আরও একটি কারণ আছে। ইনি অহেতুক ফর্দের বহর বাড়ান না, চাহিদাও বিশেষ কিছু নেই। যাই দেওয়া হোক, ইনি তাতেই খুশি, তাই বোধহয় পুরোহিত মশাই সম্বধনটুকুও তাঁর কপালে জোটে নি। এ হেন কুলপুরোহিতটির খোঁজখবর কিন্তু কেউ রাখেন না, এমন কী তিনি কোথায় থাকেন, বাড়িতে তাঁর আর কে কে আছে, এ বাড়ির কেউ জানেন না। হয়তো ধমনীতে জমিদারী রক্ত বওয়ায়, গরীব চালকলা বিদ্যের পুরোহিতটির খোঁজখবর রাখার প্রয়োজন অনুভব করেন না।

গতবছর দূর্গাপূজার আগে চক্কোত্তী বামুন যথারীতি এসে পূজার ফর্দ দিয়ে গেলেন। পঞ্চমী থেকে নবমী, বাড়িতে বিরাট হৈ চৈ। একসাথে পূজার কাজ, দু’বেলা পাত পেড়ে খাওয়া, এমন কী রাতেও নিজের ঘর পরের ঘর বলে কোন ভেদাভেদ রইলো না। যে যেখানে পারলো গড়িয়ে নিয়ে রাতটা কাটালো। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের পর গোটা বাড়িতে শ্মশানের নীরবতা।  

পরদিন চক্কোত্তী বামুনের সাথে তাঁর বাড়ি যাওয়ার জন্য আমি বায়না শুরু করলাম। গরীব ব্রাহ্মণের বাড়িতে আমার থাকাখাওয়ার কষ্ট হবে, পড়াশোনার ক্ষতি হবে, সর্বপরি গৃহশিক্ষক এসে ফিরে যাবেন, এইসব নানা কারণ, প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালো। চক্কোত্তী বামুন সকলকে আশ্বস্ত করে বললেন, “কোন অসুবিধা হবে না, আমি লক্ষ্য রাখবো”। আমার বয়স এখন তিরাশি, আজ থেকে প্রায় পঁয়ষট্টি বছর আগে, তখন আমি মোটেই ছেলেমানুষ ছিলাম না, তবু বাড়ির অভিভাবকদের রাজী করাতে অনেক সময় গেল। শেষে আমার এক বন্ধুকে নিয়ে দুপুরের দিকে চক্কোত্তী বামুনের সাথে তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।  

আমাদের বাড়ি থেকে বেশ কয়েকটা রেলওয়ে স্টেশন পার হয়ে আমরা নামলাম। চক্কোত্তী বামুন জানালেন আগে তার পূর্বপুরুষদের, আমাদের বাড়ি আসার জন্য এই পথটা হেঁটে অথবা গরুর গাড়িতে আসতে হ’ত।  যদিও আজ এত বছর পরে এত উন্নতির পরেও স্টেশন থেকে হেঁটে ও ভ্যান রিক্সায় অনেকটা পথ পাড়ি  দিয়ে, সন্ধ্যার দিকে আমরা তালডুংড়ি গ্রামে এসে পৌঁছলাম। চারিদিক আম কাঁঠলের গাছে ঘেরা একটা বড় বাগান পার হয়ে, কিছুটা পথ গিয়ে একটা মাটির দোতলা ছোট্ট বাড়ি। আমরা আসবো এদের জানার কথা নয়, তাই ঝকঝকে উঠোন দেখে বোঝা গেল এরা আমাদের থেকে অনেক বেশি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। চক্কোত্তী বামুনের হাঁকডাকে ও পায়ের আওয়াজে দু’তিনজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। চক্কোত্তী বামুন আমাদের পরিচয় দিয়ে ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বিছানা পাতা একটা চৌকিতে বসালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক বৃদ্ধা ঘটি করে জল নিয়ে এসে হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে আরাম করে চৌকিতে উঠে বসতে বললেন। না, ঠিক বললাম না,   বসতে অনুরোধ করলেন বললেই ঠিক বলা হবে। চক্কোত্তী বামুন পরিচয় করিয়ে দিয়ে জানালেন, ইনি তাঁর স্ত্রী। আমরা সেইমতো হাতমুখ ধুয়ে পরিস্কার হয়ে কাপড় বদল করে চৌকিতে আরাম করে গুছিয়ে বসলাম। চক্কোত্তী বামুন কিন্তু ঘর ছেড়ে কোথাও গেলেন না।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ভদ্রমহিলা দুই হাতে দুই থালা মুড়ি নিয়ে এলেন, সঙ্গে কিছু ভেজানো ছোলা, বাদাম ভাজা, নারকেল টুকরো আর অতি সুস্বাদু খানিকটা তাল পাটালি। সবে দূর্গাপূজা শেষ হয়েছে, কাজেই ঠান্ডা না পড়লেও গরম কিন্তু সেরকম নেই। ভদ্রমহিলা তবু একটা হাতপাখা নিয়ে আমাদের পাশে বসে হাত নাড়তে নাড়তে তাঁর স্বামীকে বললেন, “আমি বসছি তুমি জামাকাপড় বদলে এসে এনাদের পাশে বসে একটু বাতাস করো। আমি বরং ঐ দিকটা একটু দেখি”। (পরের পাতায়)

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2015-2016 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.