প্রেমের দ্বিতীয় অধ্যায়


 

আজ ক্লাস ইলেভেনের প্রথম দিন স্কুলে যাব।বেশ উত্তেজিত আমি।হবে নাই বা কেন!? নতুন স্কুল বলে কথা! তার ওপর এই স্কুল টাতে ইলেভেন-টুয়েলভ এ ছেলে ও মেয়েরা পড়ে।আবার এই প্রথম শাড়ী পরে স্কুলে যাব।সব মিলিয়ে আমার উত্তেজনা তুঙ্গে! যাই হোক শেষমেষ মায়ের অগাধ পরিশ্রমে আমি শাড়ী পড়লাম।পাশের পাড়ায় নীলা থাকে।এই মুহূর্তে ওই আমার স্কুল যাওয়ার একমাত্র সঙ্গী।তাই ওকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।স্কুলে গিয়ে মেয়েদের সারির তৃতীয় বেঞ্চে বসলাম দুজনেই।আমি তো এদিক ওদিক তাকিয়ে ক্লাস রুম টা দেখছি।দেখলাম,নীলার পাশেই ছেলেদের সারির বেঞ্চে বসে থাকা একজন ছেলের সাথে কথা বলছে নীলা।ওদের কথাবার্তা শুনে বুঝলাম যে ওরা পূর্বপরিচিত।ওদের কথা শেষ হওয়ার পর নীলা বলল, "ওর নাম অভিষেক মাইতি,আমরা একই কে.জি স্কুলে পড়তাম,এতদিন পর ওর সাথে দেখা হল,তাই কথা বলছিলাম।"

 

"ওহ্,আচ্ছা। " বলেই আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম।ছেলেটা রোগা,লম্বা,ফর্সা সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর দেখতে;সবচেয়ে ভালো লাগলো তার মুখটায় সবসময় সারল্যের ছাপ আর মিষ্টি হাসি লেগে আছে।বেশ কদিন কাটার পর স্কুল যাওয়ার প্রতি আর টান নেই।একপ্রকার সবার বকুনি অগ্রাহ্য করেই স্কুলে যাওয়ার বিরতি টানলাম।কয়েকদিন পর,একদিন ক্লাসরুমে বসে নীলা হঠাৎ বলে বসল, "তোর রোজ স্কুল আসতে ইচ্ছে হবেই,যদি আমার কথা শুনিস! "আমি খানিকটা রেগে গিয়ে বিরক্ত হয়ে বললাম, "তোর কি কথা শুনব?" নীলা বলল, "আমাদের স্কুলের আমাদের ক্লাসের কোনো ছেলের সাথে প্রেম কর " আমি বললাম, "থাম তো,যত্তোসব!কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিবি না ".বলেই আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।নীলা আরও কাছে এসে বলল, "একবার প্রেমে সফল হলি না বলে আর প্রেম করবি না,তা ঠিক নয়!আর একবার চেষ্টা করেই দেখ না কি হয়! "এবার সত্যিই আমি কেঁদে ফেললাম।নীলা আমাকে চুপ করতে বলল।সেই মুহূর্তে নিজের অজান্তে আমার চোখ গেল অভিষেকের দিকে।একি!সে যে আমার দিকে তাকিয়ে আছে! নীলা কে ফিসফিসিয়ে বলতেই,নীলা বলল, "ওরে নাহ্!এই তো সুযোগ এসে গেল!শুরু করে দে! "আমি লজ্জা পেয়ে বললাম, " ধুর্! " কিন্তু মনে মনে একটু সায় দিলাম।বেশ অবাকও হলাম।এত মেয়ে থাকতে আমার দিকে তাকাল কেন?তবে কি ওর ও আমার প্রতি.....।আচ্ছা দেখা যাক ও আমার দিকে রোজ তাকায় কি না।এবার আমার স্কুল যাওয়া শুরু হল।

 

বিদিশা ও সোনিয়া কে ব্যাপার টা জানালাম।ওরাও রাজী,আমাকে অনুমতি দিল! বেশ কাটছে দিনগুলো।কিভাবে যেন ইলেভেনের বিজ্ঞান বিভাগের সমস্ত ছাত্ররা আমার অভির প্রতি ভালোলাগা জানতে পেরে গেল!ব্যাস্!আর কী?শুরু হল তুমুল জটলা।অভি যখন চুপচাপ ক্লাসে বসে থাকত,তখন ওকে ছেলেরা দাদা-বৌদি বলে রাগাত।কিন্তু সে কিছুই বলত না ওদের কে ।বরং আমি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতাম।তবে আমাদের দুজনের চোখাচোখি চলতে লাগল।দুজনের পরিচয় হল না তবু নিরবে মনের ভিতর ভালোলাগা টা ক্রমেই বাড়তে লাগল।অনেক দিন কেটে গেল।উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ।তাই বলে কি মন থামে!? অনেক কষ্টে অভির ফোন নাম্বার জোগাড় করলাম।আমার নিজের মোবাইল নেই।তাই মায়ের ফোনে অভি কে ফোন করলে টকটাইম শেষ হলে আর রক্ষে নেই! বাবা তো সবসময় বাড়িতে থাকে না।তাই শেষমেষ নিজের হাতখরচ বাঁচিয়ে একটা নতুন সিমকার্ড কিনলাম,ভালোরকম টকটাইমও পেলাম।ঠিক করলাম যে মায়ের ফোনে নতুন সিমকার্ড লাগাবো যখন অভি কে ফোন করবো।যাই হোক প্রথম দিন ভয় ভয় করে ফোন করলাম অভিকে। "নীলার সাথে আমি সবসময় থাকি "এটুকু বলতেই আমাকে চিনে নিল।শুরু হল রোজ ফোন করা।আমি ই ওকে ফোন করতাম সবদিন।তবে শুধুই পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা হত।ওর নামে মন্দিরে পূজো দিতাম,প্রসাদ নিতে ডাকতাম ওকে।ও আসত না,বলত প্রসাদ জলে ফেলে দে ।খুব রাগ হত।রাগ চেপে রাখতাম,পাছে ও জানতে পারলে যদি ফোনে আর কথা না বলে!ইচ্ছে করে ওকে বলতাম যে আমার অংকের সমস্যা হচ্ছে ।রোজ রোজ নতুন সমস্যার অজুহাতে ওকে ফোন করতাম ।আমার তিন সখী ছাডা় এটা আর কেউই জানত না ।টিউশান পড়তে গিয়ে ক্রমে বুঝতে পারছি ছেলেগুলোর মুখ বন্ধ করতে হবে!ওখানেও আমাকে বৌদি বলে ডাকে আড়াল থেকে ছেলে গুলো।

 

না,না,কিছু একটা করতেই হবে!ইংরাজী স্যার কে ফোন করে ছেলে গুলোর কথা জানিয়ে অভিযোগ করলাম।আমি বললাম যে আমি অভির সাথে কথাই বলি না,ওর সাথে আমার পরিচয় নেই।আমি যে অভির সাথে ফোনে কথা বলি ,স্যার টের ও পেলেন না।কাজেই ছেলে গুলো আচ্ছা মতো বকুনি খেল।আর আমি স্যারের কাছে লক্ষ্মী ছাত্রী থুড়ি লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে গেলাম!বেশ কিছুদিন চলার পর হঠাৎ একদিন ওকে ফোন করে খুব আঘাত পেলাম।কি হল?লায়লা কে আঘাত পেতে হল তাও কিনা মজনুর কাছ থেকে!নাহ্ ,ব্যাপার টা তলিয়ে দেখা যাক।তখন যেন মনে হল ওর পাশে ওর মা আছে।তাই হয়তো এভাবে রেগে রেগে ফোনে কথা বলছে।ওর মা ফোন ধরল।আমাকে যা বললেন,তাতে আমার এত আশা,পরিশ্রম সব এক নিমেষে তুচ্ছ হয়ে গেল! তিনি বললেন, "জানি , তুমি অভি কে নিজের ভাই এর মত ভাবো........."তারপর আর কোনো কথা আমার কানে ঢোকেনি।খানিক পর নিজের জড়তা কাটিয়ে এবার বললাম, "দেখুন জ্যেঠিমা,আপনি আমার মায়ের মত।স্কুলে ছেলেরা আমাকে আর অভি কে নিয়ে এত হৈচৈ করে,তবু অভি চুপ থাকে কেন!?ওতো কিছু বলতে পারে ওদের কে!ও তো জানে আমাদের মধ্যে কিছুই নেই।তবু চুপ থাকে কেন?আমার তো খারাপ লাগে!তাই ওকে প্রতিবাদ করতে বলি। " তিনি বললেন, "যদি কাক তোমার কান কেটে নিয়ে পালায়,তুমি কি কাকের পিছনে ছুটবে? "ব্যাস্,আমি চুপ হয়ে গেলাম।তারপর অনেক দিন ওকে আর ফোন করিনি।কলেজে উঠে ওকে ফেবুতে রেখেছি।খুব কম কথা হয়।হঠাৎ একদিন অভি বলল, "আমার জন্য একটা গার্লফ্রেন্ড খুঁজে দে" ।বললাম, "গুরুদায়িত্ব টা শেষে আমাকেই দিলি!" সে বলল, "ইচ্ছে হলে কাজ টা করিস" । নাহ্,আমি কষ্ট পেয়েছি কিনা তা জানিনা নিজেই ।আজ পর্যন্ত ওকে মনের কথা জানায় নি।সেও কিছু বলেনি।তবু মনে হয় আজও যেন সে আমার মুখ থেকে কিছু শুনতে চায়।প্রেমের দ্বিতীয় অধ্যায় টাতে না হয় অব্যক্ত ভালোবাসা বিরাজ করুক!

 

 

********************************************

 

 

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2015-2016 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.