কালী
ঈপ্সিতা মিত্র
যখন মেয়েটা জন্মেছিল, ওর বাবা ছাড়া বাকি সবার মুখের হাসিই কেমন যেন মলিন হয়ে গিয়েছিল!!.. কেউই বিশেষ খুশি না... আর হবেই বা কেন!! মেয়েটার গায়ের রং যে কালো.. মেয়েটার ঠাকুমা তো সবার সামনেই বলে উঠলো সেইদিন, " মা বাপের রং তো ফর্সা, তাহলে মাইয়া টা এই রকম কালো হলো ক্যান !!"..... ওর বাবা সেইদিন প্রতিবাদ করেছিল, "মা,এই ভাবে বলছ কেন? তোমার বাড়িতে লক্ষী এসেছে...শাঁখ বাজাও, আনন্দ কর..".....ঠাকুমা মুখটা অন্ধকার করেই উত্তর দিল, " লক্ষী না , কালী আইসছে...."... জন্মের দিন থেকেই ওর ঠাকুমা ওকে একটা ডাক নাম দিয়ে দিল,'কালী'.. গায়ের রঙের সাথে মিলিয়ে নাম..নিজের মা,আত্তীয় সজন ,পারার লোক প্রত্যকের কাছে ওর পরিচয়,'কালী'... কিন্তু শুধুমাত্র একজনের কাছে ওর নামটা অন্য...ওর বাবা..অন্নপ্রাসন এর দিন ঘটা করে অনুষ্ঠান করে নিজের মেয়ের নাম দিয়েছিলেন উনি, 'অনন্যা'...যে একসেপসনাল.. সবার থেকে আলাদা.. ও যখন খুব ছোট তখন ওর মা কখনই ওকে তেল মাখিয়ে রোদে শুইয়ে রাখত না..ঠাকুমা বলত, " ওরে রোদে রাখলে গায়ের রং আরো চৈটা জাবে..অহন বিয়ের লগে ছেলে না পাইলে কিন্তু ঘরে বইসা রাখতে হইব মেয়েরে.."..তাতে বাচ্চাটা ভিটামিন ডি না পায় না পাক, এমন কিছু ক্ষতি হবে না!!... প্রথম থেকেই কালীকে অনেক কথা শুনতে হত ওর রূপ নিয়ে.. পারলে মা,ঠাকুমা ওকে স্কচ ব্রাইট দিয়ে ঘষে মেজে ফর্সা করে দেয়..কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না.!!..তাই হলুদ, চন্দন, মুলতানি মাটি থেকে ফেআর এন্ড লাভলী, এই সবই ভরসা!!.. ও কখনই পারার বাচ্চাদের সাথে লুকোচুরি, কানামাছি এই সব খেলতে যেত না, ' রোদে রোদে ঘুরলে গায়ের রং টা তো আরো ময়লা হয়ে যাবে..".. তাই যেন দিনের আলো, সূর্যের কীরণ কালীর জন্য না.. সব সময় ওকে আবরণে থাকতে হবে, লুকিয়ে রাখতে নিজেকে , নিজের গায়ের রংকে.. তখন ওর ক্লাস ফাইভ ...সেই দিন স্কুল থেকে এসে কালী জানলার একটা কোনায় চুপচাপ বসে ছিল..চোখ দুটো জলে ভাসছে..কানে যেন বাজছে স্কুলের বন্ধুদের কথা গুলো.. " অনন্যাকে রাত্রিবেলা লোডসেডিং হলে দেখাই যাবে না.. অন্ধকারে ও মিশে যাবে.."..ক্লাসে সবাই সেইদিন খুব হাসছিল,মজা করছিল.. কিন্তু কালীর মুখে হাসি ছিল না..ও কালো, ওকে খারাপ দেখতে,জন্ম থেকে কথা গুলো শুনতে শুনতে কানে সয়ে গেলেও সেই দিন সবার হাসির আওয়াজটা ওর কানে খুব লেগেছিল..সেই দিন বাবার কাছেও ও চোখের জল টা ঢাকতে পারেনি...আঁকড়ে ধরেছিল বাবার বুক.. ওই একটা জায়াগায়ই খুব নিজের.. সেইদিন বাবা দৃঢ় গলায় ওকে একটা কথা বলেছিল, " দেখ মা, লোকের কথায় কান দিস না.সেই দিন থেকেই বাবার কথাটা ও খুব মেনে চলত..ক্লাসে এরপরও এই ঘটনার অনেকবারই পুনরাবৃত্তি হয়েছে, "এই দেখ মা কালী ক্লাসে এসেছেন,জবার মালা নিয়ে আয়.." বা, "কিরে কত টাকার আলকাতরা কিনে রোজ স্রান করার পর গায়ে মাখিস রে!!" এই সব লাইন গুলোও বার বার শুনতে হয়েছে ওকে....কিন্তু আর কখনো ওর চোখে জল আসেনি.. বরং হেসেই ও উত্তর দিত, " সেই,আমি তো মা কালী, আয়,আমার পায়ে নমস্কার কর..একটু আশির্বাদ করি,তাতে যদি তোদের রেসাল্ট এ আরো দু চার নম্বর বেড়ে যায়!!".... এই ভাবেই দিন গুলো কাটছিল..দেখতে দেখতে এখন কালীর ক্লাস নাইন !!..এই সময়ই স্কুলে একজন ক্যারাটে টিচার এর আগমন ঘটল.. রোজ স্কুল ছুটির পর আধ ঘন্টা ক্লাস..সরকার থেকে নিয়ম হয়েছে তো মেয়েদের সাবলম্বী করতে হবে.. তাই যাদের ইচ্ছা তারা এই ক্লাস করতে পারে .. প্রথমে কথা টা শুনেই মা ঠাকুমার এক বাক্যে না, মা বলল " পাগল না মাথা খারাপ..রোদের মধ্যে মাঠে দাঁড়িয়ে এক ঘন্টা করে মারপিট শেখাবে!! কালী একদম ঐসব ক্লাসে যেতে হবে না..", আর ঠাকুমা তো আরো এক সুর চড়িয়ে বলল, " কি দিন দেখনের লগে বাইঁচা আছি..মাইয়াদের মারপিট শেখানোর ক্লাস!! খবরদার কালী , এই রকম বেহায়াপনা আমি সয্য করুম না.."....সেইদিন ক্যারাটে শেখার আর্জি ওর খারিজই হয়ে যেত যদি বাবা না থাকত, "না,আমার মেয়ে ক্যারাটে শিখবে..রাস্তা ঘাটে যা হয় শুনি আজকাল.. মেয়েদের এই সব জেনে রাখা ভালো..".......সেই মুহুর্তে কালীর মুখে হাসি.. এই প্রথম নিজের ইচ্ছে মতন একটা কিছু করবে!!.. তবে একটাই ব্যাপার যেটা ওর পছন্দ ছিল না যে তারপরের দিন থেকে স্রান করার আগে এক বাটির জায়গায় দু বাটি হলুদ মাখতে হত,ঠাকুমার হুকুম.. সময়ের কাঁটা এগিয়ে চলে নিজের তালে,নিজের ছন্দে.. কালীর গ্রাজুএসন কমপ্লিট..আজ ইউনিভার্সিটি তে ওর প্রথম ক্লাস..মাস্টার্স এর ছাত্রী ও..এই ব্যাপারটায় ঠাকুমা বেঁচে থাকলে আজ নিশ্চয় আপত্তি করত, যে " মাইয়াদের অত পড়ালিখার কি আশে!! বরং স্কুলের পরই সম্বন্ধ খোঁজা দরকার..জা গায়ের রং, পার করতে জামেলা হইব..তাই আগে থেকেই চেষ্টা চরিত্তির করা ভালো.."..বাসে আসতে আসতে এই সব কথা ভেবেই কালীর একটা হাসি চলে এলো মুখে.. ঠাকুমার আত্মা আজ খুব কষ্ট পাচ্ছে..এই সব কথাগুলো শোনাতে পারছে না তো..তাই.. কালীর এখন বয়স একুশ..এতদিনে কালীর জীবনে কখনো প্রেম আসেনি..যৌবন এলেও কখনো বসন্ত আসেনি..কিন্তু ইউনিভার্সিটি তে আসার পর ওর জীবনে একটা নতুন দিক এলো..প্রথম কাউকে ভালো লাগার একটা অনুভুতি এলো.. রাহুল বলে ওদের ক্লাসেরই একজন ছেলে, যেচে পরেই ওর সাথে এসে আলাপ করেছিল সেইদিন.. "কাল তো তুমি আসোনি..এই নোটস গুলো রাখো..পি.কে স্যার দিয়েছেন..তোমার কাজে লাগবে..",..কথাটা বলেই রাহুল নোটস এর খাতাটা ওর হাতে ধরিয়ে দিল.. কালীর একটু অবাক লাগলো..রাহুলকে দেখতে বেশ হ্যান্ডসম..মেয়েরা ক্লাসে ওর সাথে কথা বলার জন্য একটা সুযোগ খোঁজে.. সে ওকে নোটিস করেছে, আবার নিজে যেচে পরে নোটস দিতেও এসেছে!!.. পরের দিন নোটস এর খাতাটা যখন ক্যান্টিনে ও ফেরত দিতে গেল রাহুল আবার ওকে অবাক করে দিল ওর ফোন নাম্বার চেয়ে.. একই ক্লাসে পরে.. নাম্বার চাইলে তো দিতেই হয়.. হয়ত এমনিই চেয়েছে..কোনো রকম নোটস এর ব্যাপারে দরকার হলে কল করবে বলে!!.. এই সব ভেবেই বাড়ি ফিরেছিল..কিন্তু ভাবনাটা মিলল না.. রাত্রিবেলা ওর ফোনে রাহুলের মেসেজ , " কি করছ ? ডিনার কমপ্লিট..",...এরপর কারণে অকারণে রাহুল ওকে অনেক মেসেজই করত.. ক্যান্টিনে দেখা হলে কফি খাওয়াত, ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ হলে একই বাসে উঠে যেত, অকারণে অনেকটা রাস্তা হাঁটত ওর সাথে গল্প করতে করতে.. আকারে ইঙ্গিতে বার বার ই বুঝিয়ে দিত নিজের ফিলিংস ... কালী বুঝেও বুঝত না..আসলে ছোটবেলা থেকেই নিজের রূপ ,রং নিয়ে এত কথা শুনে এসেছে যে ও নিজেও বিশ্বাস করে নিয়েছে ওকে দেখতে বাজে.. ও কালো তো,তাই ওর দিকে কোনো সুন্দর ছেলে তাকাতেই পারে না!!.. বার বার তাই নিজের মনকে বোঝাত যে যেটা হচ্ছে,সেটা নিছকই বন্ধুত্ব.. কিন্তু সেই দিন রাহুল আরও সোজাসুজি ভাবেই কথাটা বলল, "আচ্ছা অনন্যা ,যদি আমি কখনো তোকে প্রপোস করি,তুই হ্যান বলবি?"..... ও চুপ..এর কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না.. রাহুল কি মজা করছে!!.."না অনন্যা .আমি কিন্তু মজা করছি না..আমি সিরিয়াস..".... চোখে চোখ রেখে রাহুল কথাটা বলল.. না, এটা মজা না.. কেউ এত দৃঢ় গলায় মজা করতে পারে না!!.. ও বিশ্বাস করেছিল... এরপরের একটা মাস সপ্নের মতন ছিল.. এই প্রথম ও নিজেকে আয়নায় মন দিয়ে দেখল.. নিজের নাক,চোখ ,মুখ টা কে দেখে আজ ওর মনে হচ্ছে ও সুন্দরী..আসলে এখন ও নিজেকে রাহুলের চোখ দিয়ে দেখে.. এই প্রথম ওকে কেউ কালো বলে না..বরং বলে, "তোর হাসিটা খুব মিষ্টি.."..এই প্রথম কেউ ওকে দুটো মুগ্ধ চোখ নিয়ে দেখে..সেইদিন ওই চোখ দুটোতে ও যেন হারিয়ে গিয়েছিল..ইউনিভার্সিটি শেষ এর পর গঙ্গার ধরে শুধু ওরা দুজন..আকাশে মেঘ করেছিল..গুমোট একটা গরম ছিল..কিন্তু হটাথ ঝড়ো হাওয়া দিয়ে পরিবেশটা অনন্য রকম করে দিল..তারপর মেঘ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল..আর সেই বৃষ্টিতে ভিজলো ও আর রাহুল..এই বৃষ্টিটা ওদের শরীর মনকে ভিজিয়ে দিল হটাথ..প্রেমের একটা সীমা অতিক্রম করলো ওরা.. কিন্তু সেই বৃষ্টির দিনটার পর হটাথ খটখটে রোদ উঠলো পরের দিন.. রাহুল আর এখন ওকে দেখেও দেখে না..চিনেও চেনে না.. মেসেজ এর রিপ্লাই করে না, ফোন ধরে না.. হটাথ এই বদল কেন!! কি এমন হলো!! ও কি কোনো ভুল করেছে!! চারিদিকটা কেমন যেন অন্ধকার লাগে এখন..কিছু যেন একটা হারিয়ে গেছে বলে মনে হয় সারাক্ষণ. না,এই ভাবে চুপ থাকতে পারবে না ও.. ..সেই দিন রাহুলকে করিডরে একা দেখে ও জিগেশ করলো ওর মনের জমাট প্রশ্ন, " রাহুল , কেন আর তুই আমার সাথে কথা বলছিস না..কি হয়েছে তোর?" " কথা!! তোর আর আমার মধ্যে কি কথা থাকতে পারে!! অদ্ভুত কোয়েস্চেন.." " এই সব তুই কি বলছিস... তোর আর আমার মধ্যে কথা নেই!!..তাহলে এতদিন আমার সাথে কি করছিলিস ?" " টাইম পাস করছিলাম.. আসলে কি বলত, ক্লাসের প্রত্যেকটা মেয়ে আমাকে নিয়ে অত মাতামাতি করে, শুধু তোকেই দেখতাম আলাদা..যেচে পরে কথা বলতিস না, লাইন মারতিস না.. তাই মনে হলো তোকে তুলি.. এনিওয়ে ইউ শুড থ্যান্ক মি ফর দিস.. এই সুযোগে তোর একটা প্রেম তো করা হলো লাইফ এ.. নইলে তোকে যা দেখতে!!.. " কথা গুলো বলে সেইদিন রাহুল চলে গিয়েছিল..কিন্তু ও যেতে পারেনি..এক পা ও এগোতে পারেনি সেইদিন..আজকের অপমানটা ওর জীবনে সেরা..সর্ব শ্রেষ্ঠ..সারা জীবন ও মনে রেখে দেবে...কিন্তু সেইদিনও ওর চোখ থেকে জল পরেনি.. খুব কষ্ট হলে হয়ত কান্নাও আসে না.. !!..চোখের জল ও নিরব হয়ে যায়.......... সেইদিন রাতে যখন ওর মা এসে ওকে বলল, "ঘুমনোর আগে এই চন্দনের পেস্ট টা মেখে নিস মুখে.."...সেইদিন ও প্রথম ওর মাকে একটা প্রশ্ন জিগেশ করলো, "আচ্ছা মা,একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করে..তুমি তো দেখি রোজ ঠাকুর আসনে মা কালীর মূর্তি ত়ে জবা ফুলের মালা পরাও,ধুপ দেখাও..পারার রখ্যাকালি পুজোত়ে রাত জেগে ভোগ রান্না কর.. তাহলে তোমার কালো রং এত অপছন্দের কেন!! "..... ওর মা চুপ ছিল এই প্রথম.. এর কোনো উত্তর জানা নেই ওর মার.. সেই নিঃস্তব্ধতা ভেঙ্গে কালী বলল, " নিয়ে যাও এই চন্দন বাটা..আজ থেকে আমি কিছু মাখবো না আমার মুখে..আমার রং,আমার শরীর যেই রকমই হোক,সেটাকে আমি ভালবাসি..আর সেটা বদলানোর প্রয়োজন মনে করি না.."........ চার বছর কেটে গেছে.. রাহুল আজ থানায়..বধু নির্যাতনের কেস.. এফ.আই.আর এর ভিত্তিতে সোজা বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়েছে .. লক আপের ভেতরে বসে আজ প্রথম ওর খুব ভয় লাগছে..পুলিশ এর থার্ড ডিগ্রির শুধু নামই শুনেছে, সেটা কেমন আজ না ওকে ফেস করতে হয়!!.. এই সময়ই লক আপের দরজা খুলে ইনসপেকটর ভেতরে ঢুকলো.. রাহুল এবার অবাক, "অনন্যা তুমি? এখানে?"......... পুলিশের পোশাক পরে অন্য রকম লাগলেও রাহুলের চিনতে ভুল হয়নি,.."হ্যা,আমি..এই থানার ইনচার্জ .. সো লাস্ট এ বধু নির্যাতন এর কেস!!.. এখন মনে হয় বউ এর গায়ে হাত তুলে টাইম পাস কর.. অবস্য তোমার কাছ থেকে এর বেশি কিছু এক্সপেকটেড না.. বাট ডোন্ট অরি..আমার আন্ডারে এই থানায় ২৪ ঘন্টা থাক..মেয়েদের সম্মান কি করে করতে হয় খুব ভালো করে শিখিয়ে দেব....".. সেই কেস এ রাহুলের পাঁচ বছরের জেল হয়েছিল..ও নিজের হাতে চার্জ সিট তৈরি করে কোর্টে জমা দিয়েছিল... আজ ওর বাবা মাথা উঁচু করে সবার সামনে বলে, " মার দেয়া কালী নাম টা সার্থক.."....

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.