পুনর্মিলন


 

একটা ছোট মফঃস্বল শহর এমন সুন্দর আধুনিক শহরে পরিণত হতে পারে ভাবতেই পারছেনা কুমার।কুমার বসু । তার বাবা এই শহরেও শিক্ষকতা করেছেন একেবারে চাকুরী জীবনের শেষ পর্যায়ে। তার আগে ,হাইলাকান্দি,বদরপুর,সালচাপড়া,করিমগঞ্জ , লালাবাজার এই রকম সব শহর ও গঞ্জে,অবশ্যইবিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন । শিলচর ছিল জেলা শহর। এর সামুহিক উন্নতি অন্যান্য পাশাপাশি জায়গা গুলো থেকে দ্রুত হয়। কুমারের বাবা অনেক আগেই এই শহরে কিছু বসত জমি কিনে রেখেছিলেন। রিটায়ার করে এখানেই বাড়ী করে স্থায়ী ঠিকানা করলেন।কুমারের মায়ের ইচ্ছে ছিল কলকাতা, নাহলে নিদেন পক্ষে,কুচবিহার ,শিলিগুড়ি হলেও হত।কলকাতায় কুমারের মামারা থাকেন ও। কিন্তু কুমারের বাবা কারো কথাই শুনলেন না।মা দিনরাত নিজের বিরাগ প্রকাশ করতেন এই বলে যে আত্মীয়স্বজন বিবর্জিত অজপাড়া গাঁয়ে থাকতে তিনি পারবেন না। কে কার কথা শোনে? 


এমনিতে আসামের কাছাড় জেলার জেলা শহর শিলচর বরাক উপত্যকায় চা বাগান অধ্যুষিত। আসামে হলেও মূলত বাংলাভাষীদের বাস এই শহরে।এই বাংলা ভাষা নিয়ে শিলচরে কম আন্দোলন হয়নি। ১৯৬১ সালে ভাষা আন্দোলনে শহীদ হন কমলা ভট্টাচার্য্য সহ দশজন।কুমার তখন প্রাইমারীতে পড়ত। তাদের স্কুলও লাগাতার একমাস বন্ধ ছিল।শেষ পর্যন্ত আসাম সরকার বাংলাকে দ্বিতীয় রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন। এসব অনেকদিন আগের কথা। ১৯৬৭ তে মাধ্যমিক পাশ করে শিলচরের কাছাড় মহাবিদ্যলয়ে ভর্তি হয়ে ইন্টারমিডিয়েট ও বি,এ পাশ করে। সেই মহাবিদ্যালয়ের হীরক জয়ন্তী অনুষ্ঠানের পুনর্মিলন ।.সেই., উৎসবের আমন্ত্রণে সুদুর অক্সফোর্ড থকে শিলচর আসা।প্রতি বছর না হলেও দুবছর বা তিন বছরে পুজোর সময় একবার আসতই এমনিতে।আসে বৃদ্ধা মাকে দেখতেও , বাবা তো অনেক আগেই পরলোকগত।বিবাহিতা বোনেরাও আসে খবর পেলে এক ই সাথে। বাড়ীতে থাকে ছোট ভাই শঙ্কর। সে নিজের পরিবার নিয়ে মাকে দেখাশুনো করে।ভ্রাতুস্পুত্র শায়ন জেঠু পেলে আর কাছ ছাড়া করেনা । পূর্ববঙ্গে কোথায় যেন বাড়ী ছিল শুনেছিল বাবার কাছে মনেও নেই, শিলচরেই জন্মেছে কুমার। ভাই বোন সকলেই কেমন যেন শিলচরকেই নিজের দেশ বলে মনে হয়- মনে হয় কি আসলেই তো । এখানকার বাংলাকেই তার যেন বেশী আপন মনেও হয়।

অনেকদিন পর কাউকে দেখলে এতদিন পরেও বলে উঠে,-" কিতারে বা ভালা উলা আছনি" অথবা"এল্কু যাইতানি?"। এসব লোকাল ডায়লেক্ট কেমন যেন প্রাণবন্ত মনে হয়।শিলচরের বিশালাকার দুর্গামূর্তির কথা সর্ব্ববিদিত।বিসর্জন ও দেখার মত। শহরের লাগোয়া বরাক নদীতে প্রতিমা নিরঞ্জন সেও এক দেখার জিনিস ছিল এদিকে। করিমগঞ্জ, বদরপুর থেকেও এই নিরঞ্জন দেখতে কত লোক যে আসতো তার কোন হিসেব নেই। রেলের অবশ্য প্রান্তিক স্টেশন এই শিলচর।শহরটি তখন ই বেশ জম জমাট হয়ে উঠেছিল। তাই হয়ত বাবার এত ভাল লেগেছিল।কলেজ থেকে যে ভাবে আসার জন্যে আমন্ত্রণ দুমাস আগে থেকে,তাতে নিষেধ করার কোন কারণ ছিলনা।

১৫ দিনের ছুটি নিয়েই আসে কুমার।দমদম হয়ে শিলচরে কুম্ভীরগ্রাম এয়ারপোর্ট । এয়ারপোর্ট থেকে আবার শিলচর, বাড়ী যেতে ৪৫ মিনিট। মনে মনে যেসব সহপাঠি/পাঠিনীদের কথা প্রথমেই মনে পড়ে ,তারা - মিতালী,পর্ণা, ছন্দা রুবি,শ্যামল, শম্ভু, হরিহর, প্রমথেশ। আরো কত যে আছে।ছেলেদের মধ্যে হরিহর ছিল একেবারে জিগরী দোস্ত, আর ,মেয়েদের মধ্যে মিতালী ও ছন্দা ই ঘনিষ্ঠ।


এতদিনে কি ছেলে কি মেয়ে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজ নিজ সংসারে। যারা শিলচরে বা আশেপাশে তারা হয়ত অনেকেই এই পুনর্মিলন উৎসবে আসতে পারে।কুমার ১৯৭১ সালে এই কলেজ থেকেই ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বি,এ পাস করে কলকাতায় মামার বাড়ী থেকে মাস্টার্সে প্রথম শেনীতে দ্বিতীয় স্থান পায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম হয়েছিল যে তার নাকি পাস করার পর ই বিয়ে হয়ে যায়। কুমার কিন্তু আরও ২ বছর ভাষা তত্ত্বের কি নিয়ে গবেষণা করে পি,এইচ,ডি করে, কলকাতায়ই একটি কলেজে যোগ দেবার পর পর ই oxford এর আমন্ত্রণ পেয়ে ওখানে যোগ দেয়। এখন সিনিয়র প্রোফেসর। অনেক দিন হয়ে গেল। এখানেও ইলিনা, জুলিয়ানা মেরী, আরও অনেকে, কেউ ছাত্রী,কেউ সহকর্মী রীতিমত প্রপোজ করেছিলো, কিন্তু যা দেশে মিতালীকে দিতে পারেনি অন্যকে দেয় কি করে, এরা তো ঠিক তাও চায়নি। যৌবনের লালসা মিটাতে চুপ হয়ে থাকেনি,নিজেরাই যে যার মত জোর করে আদায় করেছে চরম অস্বস্তির ও অশান্তির মধ্যেও। কি আর করা যস্মিন দেশে যদাচার। কিন্তু মনদেয়া দেয়ি বা স্থায়ী কিছু করেনি আজ ও কুমার। কিন্তু বয়েস অনেক হয়ে গেল নিজের যেন ভ্রুক্ষেপ নেই। পড়াশুনো নিয়ে সময় কাটাতেই ওর ভাল লাগে। কত যে জানার আছে এই পৃথিবীতে, সে তুলনায় জীবনটা কত না ছোট ।


যতোবারই শিলচর আসে, মা তো বলেন ই ।তিনি কিছুতেই কুমারের ঘর না বাধার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পান না। তীর্ষক,মোলায়েম,স্নেহমাখা সব ধরনের কথা বলেও ছেলের কাছে সদর্থক কোন কিছু পান নি।ছোট বোনটারও বিয়ে হয়েছে বিলাসপুরে। তার এক ননদ নাকি জামশেদপুরে কলেজের প্রোফেসর। তার সাথে মা বিয়ের কথা তুলতে কুমার হেসে উড়িয়ে দেয়, ,বলে,- " আমার মত বুড়ো বর কারো পছন্দ হয় নাকি? কি যে বল মা?" বোনের সামনেই কথা হয়। তখন কিন্তু বুড়ো হয়নি। এখন তো আরো কত বছর পর। Oxford এর চাকরী ও তো প্রায় ২৫ বছরের বেশী হয়ে গেল। শিলচরে নিজেদের কলেজেও প্রিন্সিপালের অফার পেয়েছে- রেসপন্স করেনি। বর্তমান প্রিন্সিপাল ৩ বছর এক্সটেনশনে আছেন। এমনি ৬৫ বছর অব্দি টিচিং স্টাফদের চাকরীর মেয়াদ প্রায় সব দেশেই, কোথায়ও একটু বেশী ও আছে। এসবই কুমার ভাবছিল বিমান যাত্রায়। যতোবার ই এসেছে, ঘুরে ফিরে দেখা হয়েছে প্রায় সকলের ই সাথে, একমাত্র মিতালী ছাড়া। শুনেছে ও জামশেদপুরে বাংলার অধ্যাপিকা। মনে হয় ওদিকেই বিয়ে করে সেটলড্। বছর ৭/৮ আগে ছন্দার সাথে দেখা হয়েছিল। ছন্দা বেশ সুর করে একটু নেচে নেচে কথা বলত, এমনিতেই স্লিম কোমলাঙ্গী। কুমারের ভাল লাগত। শহর ছাড়িয়ে এয়ারপোর্টের ধারেই একটা ধাপায় বসে শেষবার যখন দেখা হয়, জলযোগ করতে করতে ছন্দা বলে,-" দেখ কুমার,তোকে যে কেন ভালবাসতে গেলাম জানিনা। তুই যদি ওদেশেও কিছু একটা করতিস বলার ছিলনা। দেখছিস তো তোর জন্যে অপেক্ষায় থেকে থেকে আমিও শুকিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ কুমারের দুখানা হাত নিজের কোমরের কাছে নিয়ে নিজের শরীরের সাথে বেষ্টনী করে বলে উঠে ছন্দা,-" আজ পরিষ্কার করে বল তো তোর কি বিয়েতে কোন অসুবিধে আছে? মানে Genetic?"
--" নাঃ তো।" 
--" তাহলে করছিস না কেন?" মুচকি হাসি কুমারের ছন্দার কথায়।
--" আমাকে তোর পছন্দ হয়তো? " আবার বলে ছন্দা ।
--"হু " কুমার এ কথা বলামাত্রই কুমারের গালে,চোখে,মুখে অনবরত চুমু খেতে থাকে ছন্দা।
একটু সামলে নিয়ে কুমার বলে,-" তুইও ছন্দা?" 
--" তুইও মানে কি? আরো কেউ আছে? বলে ছন্দা। সেদিন এর পর ছন্দা কেমন যেন দমে গেল । বছর না ঘুরতেই ওর বিয়ের কার্ড সাথে ছোট্ট চিঠি--" আর কেউ থাকলেও আমার মত বুড়ী বানাস না।" এসব তো বেশ ক' বছর আগের কথা। বিবাহিতা ছন্দাকে দেখেনি,তবে বিয়েতে গিফট পাঠিয়েছিল। দমদম থেকে শিলচর ( কুম্ভীরগ্রাম) বিমানে ১ঘন্টার কিছু বেশী সময় লাগে। এর মধ্যেই এসব কত ভাবনায় স্মৃতি রোমন্থনে, যেন অবগাহন করে উঠল। ততক্ষণে বিমান কুম্ভীরগ্রামে অবতরণ করে। ছোটভাই শঙ্কর তার পুত্র শায়ন,বিচ্ছুটাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখা গেল। এগিয়ে যেতে ই "জেঠু" বলে চিৎকার করে দৌড়ে গিয়ে জেঠুকে জড়িয়ে ধরতে গেল। ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ীতে পৌঁছে গেল আধ ঘণ্টার কিছু বেশী সময়ে। 
শায়ন পুরো সময় জেঠুর গায়ে সেঁটে ছিল।


বাড়ীতে অপেক্ষা করছিল সারপ্রাইজ ।সেই মিতালী সেন কুমারের মার সাথে আলোচনারতা ঘরে ঢুকেই দেখতে পেল কুমার। মাকে প্রণাম সেরেই মিতালীকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে,-'' বাব্বাঃ গত,২৫/৩০ বছরে যার টিকিটিও দেখিনি,কলেজের পুনর্মিলন উৎসবে এবার যা হোক দেখা দিলে।"
--" নাতো, বছর ১০ আগে একবার তো এসেছিলুম, সেবার তুই ই তো এলিনা।"
--" এমা, তুই তোকারি করছেগো" বলে কুমার। মিতালী বলে,--" কেন তুই করেই তো কলেজে বলতাম,
তুমি করে বলছিলাম বোধ হয় সেবার। আমরা তো সহপাঠী"। " সহপাঠিনী" কুমার শুধরিয়েই প্রশ্ন করে,-
--" কোনবার?" ইতিমধ্যে কুমারের মা উঠে গেলেন দাদুভাইকে নিয়ে-- সে কি আর জেঠুকে ছাড়া যেতে চায়! এঘরে আর কেউ নেই এখন । কুমারের মা খাবার ব্যবস্থা হলেই অবশ্য ডাক পড়বে। হঠাত কুমার উঠে বলে,- " একটা জিনিস নেবে?"
--" কি জিনিস?" মিতালীর প্রশ্ন।
--" সারপ্রাইজ, নেবে কি না বল?" বলে কুমার
--" এখন এত দূর থেকে এলে, কোথায় চেঞ্জ করে কিছু খেয়ে বিশ্রাম নেবে, তা না বলে সারপ্রাইজ, আচ্ছা ধরো নেবো" মিতালির উত্তর শেষ হতেই কুমার বলে বসে,-" উঠে এসো।" উঠে এলেই ওকে জড়িয়ে ধরে ওর ,চিবুকে,ঠোঁটে , সারা মুখে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল কুমার মিতালীর ক্ষীণ বাধা না মেনে। পরে মিতালীকে আবার বলেও বসে,--" কি খুশীিতো? সেদিন যা দিতে পারিনি, আজ তাই দিলুম, হয়ত একটু বেশী ই দিলুম, কেমন লাগল বল?"
--" লেগেছে যেমন লাগার কথা। অসময়ে কি সময়ের মত হয়? কি হল হঠাৎ আজ এমনটি---?"
--" মনে হল মিতু, বোধ হয় আমার অকারণ একগুঁয়েমি অনেকেরই কষ্টের কারণ।"
--" অনেকের মানে ছন্দার । ছন্দা সব জানিয়েছে,ধাপার কাছে যা হয়েছে"
--" তাই?" মুহূর্তে কিছু ভেবে নিল কুমার। 
--" আচ্ছা মিতু --" কিছু আর না বলে,পরে বলে-" দাড়াও, মার সাথে একটু কথা বলে আসি" বলে ভেতরে গিয়ে মিনিট কয়ের মধ্যেই বলে, -" আচ্ছা মিতু আমায় বিয়ে করবে?" মিতু অবাক হয়ে বলে-" সে কি গো! বিনা মেঘেই বৃষ্টি! " তারপর চুপ হয়ে কি যেন ভাবে। চোখটা ছল ছল করে উঠে আবার। জীবনের প্রায় অন্তিমে এসে আজ এমন ভাবনা ছিলনা তো মনে।এসেছিল শুধু কুমারের মার সাথে দেখা করে তাঁর খবর নিতে। কুমার যে আসবে ধারনাই ছিলনা। তবু কুমারের কথা শুনে ওর কাছে গিয়ে দাড়িয়ে আনত চোখেই বলে--"তোর না তোমার ইচ্ছে হলে করবো।" পর মুহূর্তে কুমার আবার দৌড়ে ভেতরে ঢুকে মাকে ধরে নিয়ে এল এই ঘরে। মাকে বলল,-" মা, একে নিয়ে যদি ঘর বাঁধি তুমি রাজী?" । মিতালী দাড়িয়ে। মা তো থতমত খেয়ে মিতালীকে দেখছেন আর বলছেন-" এমন লক্ষ্মী মা যদি পাই আমার ঘরে আর কি লাগে?" বলে মিতালীর কাছে গিয়ে ওর চিবুক স্পর্শ করছেন ও কাছে টেনে নিচ্ছেন আর মিতালী ও বাধ্য মেয়ের মত মায়ের বুকে মাথাও রাখছে। পরে মা দুজনের দিকে তাকিয়েই বলেন,- " এই যদি ছিল মনে এত দেরী করলে কেন গো তোমরা? বাবা থাকতে থাকতে --"( কুমারের দিকে তাকিয়ে) কথাটা সম্পূর্ণ না করে আবার মিতালীর দিকে তাকিয়ে বলেন,-" আহারে তোমার বাবাওতো সেদিন মাত্র চলে গেলেন" কন্ঠরুদ্ধ হয়ে আসছিল যেন।


তারপর কুমার যেন ব্যাস্তসমস্ত হয়ে মাকে আবদার করেই বলছে,--" যাই হোক মা, বেশী বয়েসে বিয়ে হলেও ,বিয়ে তো করছি,কিন্তু কোন ঘটা নয়। যেটুকু না করলে নয় সেটুকু" বলে একটু থেমে বলে,-" আচ্ছা মা আমদের এখানকার কালীবাড়ীতে আজ ই যদি সেরে ফেলি এবং রেজিস্ট্রি ও করে নিই তোমার আপত্তি নেই তো?" -- " আমার কিছুতেই কোন আপত্তি নেই বাবা, তোমরা দুজনায় রাজী হয়েছ এই আমার কাছে ঢের ।"
মিতালী বলে,--" কিন্তু আমার তো বাড়ী যেতে হবে যে,ছোট ভাই আর মা আছেন তো আপনার ছেলের ই মত। একবার গিয়ে বলে আসতে হবেত। ওরাও ত অবাক হবে বিশ্বাস করতে পারবেনা।" একথা শুনে কুমার বলে,-" আমিও তোমার সাথে যাব ?"
-" না না, হঠাৎই ঠিক করলে। তারপর আজই যদি হয় এখানে প্রচুর কাজ থাকবে । আমি গিয়ে খবরটা তো দিই মাকে।" মিতালী নিজের বাড়ী গেল। ছোট শহর। রিকশা করে আধ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলো।


এদিকে কুমারের ছোট ভাই খবরটি পেয়েই একবারে তুফান মেলের মত সব খোজ খবর নিয়ে রেজিস্ট্রারের ব্যাবস্থা করে অনেক মিষ্টি কিনে এনে বাড়ীতে রাখলো। পঞ্জিকা দেখে সময় ঠিক করে মিতালীকেও জানাল। শায়ন বলে চলেছে," কি মজা, কি মজা, আজই জেঠুর বিয়ে " সব ব্যাবস্থা করলেও শঙ্কর,মার মনে যে চাপা দুঃখ অনুভব করল- এমন একটি শুভ মুহূর্তে কোন মেয়েই ত আসতে পারছেনা । বড় মেয়ে বিদেশে বেড়াতে, ওর তো অক্সফোর্ডে কুমারের সাথে দেখা করার কথাই ছিল। ছোট মেয়ে বিলাস পুরে। সবাইকে খবর দিয়েছে কুমার নিজে এবং বুড়োকালের বিয়ে হলেও পার্টি হবে সবাই এলে পরে নইলে মার মনে কষ্ট হবে। ফোনে সকলেই খুশী এবং ২/১ দিনের মাধ্যেই কবে পৌছবে জানাচ্ছে।
মিতালীর বাড়ীতেও প্রায় এক অবস্থা ওদের ভাই আর মা ছাড়া আপনজন কেউ তেমন নেই। তবু আত্মীয় স্বজন তো আছে। ফোনে জানিয়েছে। মা প্রথম শুনেই রিয়েকশন ছিল,- " সে কি! এতো উঠ ছেমরী তো র বিয়ের মতন" বলেই জিভ কেটে নিজেই নিজের কান ধরে বলে,--" না বাবা, শিবঠাকুর যে দেরীতে হলেও রাজী হয়েছেন এতেই আমি খুশী" তার পর একটু থেমে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন- " আমার মেয়েই বা কম কিসে। কুমারকে ছাড়া বিয়ে করবেনা এই ধনুর্ভঙ্গ পণ না করলে কত ভাল সম্বন্ধ এসেও ফিরে যায় ।" এসব বলে মেয়ের চিবুকে হাত দিয়ে চোখ ছল ছল করে বলেন,- " হ্যাঁরে মা তুই তাহলে পর হয়ে যাবি? " যাহোক মিতালীকেও এসব হ্যাপা পার করতে হয়। 


অবশেষে কুমারের ছোট ভাই শঙ্করের তৎপরতায় মিতালীর সহযোগিতায়, কুমারের ও মিতালীর বিয়ে সেদিন ই কালী মন্দিরে দুই পরিবারের সন্মতিতে হয়ে গেলো। শঙ্করের স্ত্রী টিও খুব সহযোগী। বেশ ক'জনের জন্যে বাড়তি রান্না করে ছিল বলেই না মিতালী সহ ওদে্র বাড়ীর কজনকে খাইয়ে দিয়েছিল।কোন হৈ চৈ নেই। শুধু বাড়ী এসে জোড়ে বাবাকে(ফটোতে ) ও মাকে প্রণাম, আগেই ঠাকুর প্রণাম সারে। আর কুমার ও মিতালী ও বেশ কিছু প্রণাম পেল ছোটোদের । মিতালী রাতটি নিজের বাড়ীতে থাকুক এটা দুইদিকের মা ই চান। একটা গাড়ী ভাড়া করা হয়েছে আজ, শঙ্করের কোন অসুবিধে হয়নি কিছুতেই। শঙ্করই রেখে এল মিতালীকে। একটা অদ্ভুত ব্যাপার কুমার কিন্তু কেমন যেন একটু নীরব হয়ে রইল।


বাড়ী এসে মিতালি আয়নার সামনে দাঁড়াল । কালই কলেজে পুনর্মিলন উৎসব সন্ধের আগে। সেখানে ওরা দুজন ই জোড়েই যেতে পারবে । একটা অভূতপূর্ব রোমাঞ্চের ভাব মনে আসছে ঠিক ই, কিন্তু সেই যেদিন ভালবেসে নিজ থেকে মাত্র একটা চুমু আশা করেছিল ২৫ টি বছর আগে, তখন কেন হতাশ করল কুমার এখনো বুঝে উঠতে পারছেনা।বলতে গেলে মিতালী প্রকারান্তরে নিজে প্রপোজ করেও ছিল সেদিন,যদিও ছন্দার মত নয়।সেদিনের প্রত্যাশিত একটি মাত্র চুমুর সোহাগ পেলে যে উত্তেজন হ'ত শিরায় উপশিরায় তাতো আজ আর হলনা,কুমারকে প্রণাম করার পর একটু বাঁচিয়ে যে দু তিনটি চুমু দিয়েছিল ও পেয়েছিল ওদের বাড়ী তে । আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখাবয়বের পেলবতা তেমন নজরে পড়েনি। মাঝ কপাল বরাবর বেশ কিছু চুলে সাদাটে ভাব,কিন্তু তোলাও তো যাবেনা। তবু যেটুকু সম্ভব প্রসাধন চর্চিত করে এতখানি বয়েসে যতোটা সম্ভব কমনীয়া করে তোলার চেষ্টা করলো। যাই হোক যেভাবে সেজেছিল,তাতেই পরিণত বয়েসে একটা তৃপ্তির আমেজ যেন পেল।কিন্তু মনে দুঃখ রয়ে যাবে চিরদিন, এজন্যে যে মাতৃত্বের আস্বাদ পাবেনা কোন দিনই। আসলে কুমার এত মেধাবী ছাত্র যৌথ জীবনের কথা সময়কালে ভাবেই নি । আজ ই বা এমন করে হঠাৎ বন্যার মত ব্যাকুলতা এল কেন--ছন্দা মিতালীকে সব জানিয়েছে জেনে? সে ও তো বেশ কয়েক বছর আগে । মনে একটা প্রশ্ন রয়েই গেল।


কলেজের "পুনর্মিলন" উৎসব পরদিন সন্ধ্যের মুখে। সকালে মিতালীকে নিয়ে এল ছোটভাই শঙ্কর।। এই অনুষ্ঠানে কুমার দম্পতী উপস্থিত থেকে পুনর্মিলন উৎসবকে, প্রকৃতপক্ষে স্বার্থক করে তুললেন বলে স্বাগত সম্ভাষণে জানালেন বর্তমান অধ্যক্ষ । তিনি এও আশা ব্যক্ত করলেন যে তাদের জীবনেও যে মিলন ঘটল তাও যেন সর্বাঙ্গসুন্দর ও স্বার্থক হয়। তুমুল হাত তালি পড়ে ।সবাই উঠে দাঁড়িয়ে দেন বলে আরও ভাল লাগছিল।কুমার নাকি প্রিসিপালের পদ নেবার কথা ভাবছে এটা সকলেই কনাঘুষো শুনেছে। এমনিতে অনুষ্ঠান ভালই হয়। অনুষ্ঠান শেষে কুমার ও মিতালী কুমারের বাড়ী আসে। বিয়ের দিনটি বাদ দিয়ে আজই ফুলশয্যার ব্যবস্থা করে শঙ্কর মার মতামত নিয়ে।ছোট ভাইয়ের কাণ্ড দেখে কুমার অখুশী নয়। নিজেই অবাক হয়ে ভাবছে সে তো আসলে এসেছিল প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে নিজের কলেজের পুনর্মিলন উৎসবে যোগ দিতে, কিন্তু মিতালীর সাথেই তো পুনর্মিলন হল। সেটা তারই উদ্যোগে স্থায়ী মিলন হল। ও নিজেও Oxford ফিরে যেতে আগহী নয় কেন সে তো জানে। এমন উগ্র নারী স্বাধীনতা ,বাপরে!

রাত্রে মিতালী ও কুমার শুয়ে শুয়ে নানা কথা বলছিল। মিতালী বলছিল--"এতগুলো তুরীয় আনন্দের দিন আমরা হেলায় হারিয়ে ফেললাম" একে অন্যের দেহে মিলে মিশে হয়ত দুজনেই কিছু ভাবছিল। কুমার উত্তরে মিতালীকে ঘনিষ্ঠ করে নিয়ে বলে-"বেটার লেট দেন নেভার" । দুটো মন দুটো প্রাণ একাত্ম হয়ে গেল ।

 

 

*********************************************************

 

 

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.