ভিন্ন স্বাদের ভালোবাসা


 

বছর দশেক পড়ে তাদের দেখা, না কোন বাইরের জগতে নয়, সম্পূর্ণ অন্য জগৎ,  ইন্টারনেটে আবদ্ধ ফেসবুকের ফ্রেমে তাদের প্রথম কথা। কেয়া ফেসবুক এ লগইন করে দেখে একটা নতুন ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট ঋক সেন... অনেক গুলো কমন ফ্রেন্ড দেখে একসেপ্ট করে নেয় সে।কেয়া রায় চেনে না ছেলেটিকে কিন্তু এতগুলো কমন ফ্রেন্ড আর স্কুল সব কিছুই যে কেয়ার সাথে মিলে যাচ্ছে, কেয়ার বড় হয়ে ওঠা মালদায়, মালদা স্কুল থেকেই সে পড়াশুনা করেছে, ঋক সেনের বাড়িও মালদায়, স্কুলও একই, ভাবতে বসে কেয়া। এর মধ্যেই ছেলেটির ম্যাসেজ-

ঋক সেনঃ হাই(hi), কেমন আছো?

কেয়া একটু ভেবে নেয়, সত্যি কি একে চেনে! 

কেয়া রায়ঃ হাই(hi), এই আছি, ইউ(you)?

ঋক সেনঃ ভালো আছি, কোথায় থাকো তুমি?

কেয়া সেনঃ আমাকে চেন?

ঋক সেনঃ হ্যাঁ, চিনব না কেন, পাশের ক্লাসেই তো তোমাকে দেখেছি, ওই ভাবেই চিনেছি, যদিও কথা বলার সাহস হয়নি তখন। 

কেয়া রায়ঃ কিন্তু আমি তো তোমাকে চিনতে পারছি না, একে একে কয়েকটা বন্ধুর নাম বলে সে।

ঋক জানায় সে চেনে সবাইকে। তারপর জিগ্যেস করল কেয়াকে তুমি কোথায় থাকো বললে না তো?

কেয়া উত্তর দেয় কলকাতায় থাকি, আচ্ছা এখন তো আমরা বন্ধু, তাহলে তুই করে বলা যেতে পারে। 

ঋক সেনঃ আচ্ছা ঠিক আছে। 

এভাবেই গল্পের শুরু, কেয়া জানতে পারে তাদের সাথেই পড়ত এই ঋক নামক ছেলেটি, রীতিমতো কেয়ার ফলোয়ার(follower)। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত,গল্প আর শেষ হয়না, কেয়া লক্ষ্য করল ছেলেটা অনবরত ম্যাসেজ করেই যাচ্ছে, কেয়ারও বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিল ব্যাপারটা। এমনি তে চ্যাট করতে তার ভালোই লাগে। তবু কেয়ার মনে হতে লাগল স্কুল থেকে ঋক চেনে কেয়াকে অথচ কেয়া কেন চেনে না, আবার ভাবনা জুটল মনে।

ঋক সেনঃ তোর সাথে কথা বলে ভালো লাগল, কাল কথা হবে, বাই, টাটা।

কেয়া রায়ঃ বাই।

কেয়া মনে মনে খুশীই হল , একটা বন্ধু পেল কেয়া, তা সে নতুন বন্ধুকে পুরনোভাবে পাওয়াই হোক কিংবা পুরনো বন্ধুকে নতুন করে পাওয়া।

   চাকরি করে ঋক, অফিসের গল্প করছিল সে, কেয়া এখনও বেকার, তাই ফেসবুক কেই আঁকড়ে পড়ে আছে আর আছে তার হাবিজাবি চিন্তা।

পরদিন সকাল থেকেই গুড মর্নিং এর বার্তা দিয়ে শুরু, তারপর দুপুর গড়িয়ে বিকেল, গল্পে কোন ফাঁকি নেই। 

এতো কথার মাঝে হঠাৎ ঋক বলে ফেলল “কেয়া তোর সাথে কথা বলতে ভালো লাগে আমার, তুই খুব ভালো, আমি তোকে ভালবাসি, আমাকে বিয়ে করবি”? 

এসব শুনে রেগে গিয়ে কেয়া বলল “ঋক কি সব বকছিস, এমনিতে আমি তোকে ভালোভাবে চিনি না, আর একদিনের পরিচয়ে কেউ এসব ফালতু কথা বলতে পারে”!

ঋক বলল ফালতু নয় রে, সব সত্যি, তুই আমাকে না চিনলেও আমি তো তোকে চিনি, সেই স্কুল থেকেই ভালো লাগত তোকে কিন্তু কোনদিন সাহস হয়নি বলার”।

কেয়া কোন কথা না বলে একদম আনফ্রেন্ড করে দিলো ঋককে।

পরেরদিন ঋকের ম্যাসেজ আবার“ সরি, কিছু মনে করিস না, ভুল হয়ে গেছে, এতো তাড়াতাড়ি বলে ফেলেছি, সময় নিয়ে বলা উচিত ছিল আমার, ক্ষমা করে দে, আর এতো রাগ যে তুই আমাকে আনফ্রেন্ড করে দিলি,” আবার রিকুয়েস্ট পাঠায় ঋক।

কেয়া আবার একসেপ্ট করে তাকে, আবার চলল তাদের গল্প।গল্প ঝগড়া আর ঋককে আনফ্রেন্ড, একসেপ্ট এসব করেই কেটে গেল একটা বছর।

এখনও তাদের কথা হয় কিন্তু ঠিক যেন আগের মতো নয়। ঝগড়া রাগারাগি আর হয় না। কথার চেয়ে নিরবতাই বেশি, একটা বছর তাদেরকে যেন অনেকটা বড় করে দিয়েছে।

ঋক এখনও আশা ছাড়েনি, সময় সুযোগ বুঝে মাঝে মাঝেই তার প্রেম নিবেদন করতে থাকে, কেয়া আর আগের মতো অত রেগে যায় না।

      কেয়ার ভাবনাতে আসে “চেনা লোকগুলো কেমন অচেনা হয়ে দূরে সরে গেছে, অথচ ঋক অচেনা হয়েও কতটা আপন হয়ে গেছে, অদ্ভুত এক সম্পর্ক, কোন দিন ভালোভাবে না দেখা, না কথা হওয়া মানুষ টা আজ ফেসবুকের মাধ্যমে নিজের হয়ে গেছে”।

“কিরে খেতে আয়” কেয়ার মায়ের গলা, চমকে উঠে চটপট কেয়া খেতে যায়। ইতিমধ্যে মায়ের সব জানা হয়ে গেছে যে মেয়ে সারাদিন ফেসবুকে সময় নষ্ট করছে, খাবার বাড়তে বাড়তে বলে “এসব কি হচ্ছে কেয়া, এতো সময় এইভাবে নষ্ট করছ কেন? নেক্সট পড়াশুনাটাও করলে না, কি হবে তোমার বল তো”। মায়ের বকা শুনেও শুনতে পেল না কেয়া, কথা গুলো যেন শুধু কানেই গেছে মন পর্যন্ত পৌঁছায়নি। মেয়ের কোন উত্তর না পেয়ে মা আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বাসনপত্র গুছিয়ে শুতে গেল। কেয়া খাবারগুলো নাড়াচাড়া করে একটু খেলো বাকীটা ছড়িয়ে ফেলে মুখ ধুয়ে শুতে গেল। তার ভাবনাগুলোকে আড়ালে রেখে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।

 

পরের কিছুদিন সে ঋকের সাথে কথা বলেনি, কিন্তু কোথায় যেন কিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল, নেশার মতো আবার সে ফেসবুকে যায়, ঋকের সাথে কথা বলে কেয়া কিন্তু কেমন যেন অন্য মনস্ক। ঋকও সেটা বুজতে পারে। 

 ঋক বলে “ আমি কাল কলকাতায় যাবো পরীক্ষা দিতে, আমার সাথে দেখা করতে পারবি? আমি তো এখন তোর চেনা পাবলিক হয়ে গেছি, আর নিশ্চয় রাগ করবি না”!   

 কি মনে করে কেয়া বলল “ ঠিক আছে তাহলে কাল সাউথ সিটি মলে আসিস বিকেল ৫ টায়”।

 ঋক বলল “আচ্ছা”।

পরদিন বিকেলে ভাবনা মতই কাজ, কলেজের নাম করে মাকে লুকিয়ে কেয়া সাউথ সিটিতে গেল ঋকের সাথে দেখা করতে। বিকেলটা ভালোই কাটল তাদের। দুজনে দুটো আইসক্রিম খেলো। তারপর ঋক কেয়াকে বাসে তুলে দিয়ে ফিরে গেল তার বন্ধুর বাড়ি।

কিছুটা রাস্তা আসার পর কেয়ার বাসের অ্যাকসিডেন্ট হয়, কেয়ার মাথায় প্রচণ্ড চোট লাগে, অজ্ঞান হয়ে যায় সে, তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।কেয়ার বাড়ির লোকরা তড়িঘড়ি হাসপাতালে পৌঁছায়। সারা রাত তাদের কাটে উদ্বিগ্নে। ভোর বেলায় কেয়ার জ্ঞান ফেরে কিন্তু কিছুই তার মনে পড়ে না, স্মৃতিশক্তি হারিয়েছে সে। 

সন্ধ্যের দিকে তাকে বাড়িতে আনা হয়, সম্পূর্ণ বেড রেস্ট। হাতের কাছে ফোন টা হঠাৎ বেজে ওঠে, কেয়া তোলে ফোন টা, ওপাশ থেকে “ কি রে কতবার ফোন করছি ধরবি তো, ঠিক ভাবে বাড়ি পৌঁছেছিস কিনা সেটুকু অন্তত জানাতে পারিস নি”!

কেয়া বলে “ কে আপনি, আমি আপনাকে চিনতে পারছি না”।

ঋক কিছু বলবে তার আগেই কেয়ার মা ফোনটা নিয়ে বলে “তুমি হয়তো কেয়ার কোন বন্ধু,কাল রাতে কেয়া বাস অ্যাকসিডেন্টে মাথায় চোট পায়, আজই হাসপাতাল থেকে ওকে বাড়িতে আনা হয়েছে, ও ওর সম্পূর্ণ স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে, আমাদের কাউকে চিনতে পারছে না”।

ঋক শুধু “ও” টুকু উচ্চারণ করতে পারল কোন রকমে।

ফোনটা রেখে দিয়ে চোখ মুছল ঋক, চোখের জল বাঁধ মানে না, নিজে নিজেই বিড়বিড় করল “সব স্মৃতি ধুয়ে মুছে গেল, এখন আর আনফ্রেন্ডও করবি না, আমার উপরে রেগেও যাবি না, আমাকে তো চিন্তেই পারবি না তুই ! কিন্তু আমি থাকবো তোর জন্য অপেক্ষায় ,তুই একদিন ঠিক ভালো হয়ে উঠবি,সেই আশাতেই তোর স্মৃতি নিয়েই আমি বেঁচে থাকবো, পাশে থাকবো যতদিন আমি বেঁচে আছি”।।

 

 

************************************************

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2015-2016 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.