নষ্ট মনের নষ্টামী


তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি , শ্যামবাজার থেকে শোভাবাজারের দিকে যাওয়ার রাস্তায় ৩নম্বর গলির মুখেই ছিল আমাদের জীবন বিজ্ঞানের কোচিং সেন্টার । তার ঠিক ৫০০-৭০০ মিটার দূরত্বেই নাকি জীবন নিয়ে খেলা চলে, এ কথাও কানা ঘুসো শুনতাম বটে। বন্ধুরাও হাসি ঠাট্টায় মধুচক্রের কথা বলতো। সত্যি বলছি , ততটা পরিষ্কার ছিলোনা সম্পূর্ণ ধারণাটা। জানতাম শুধু 'ও-পাড়ায় নোংরা ,নষ্ট মেয়েরা থাকে' , 'ও-দিকে কেউ ভুলেও পা বাড়ালে সেই মেয়েদের খপ্পরে পরে , আর একটা বার মধু আহরণে মৌমাছি হতে গেলে সারা জীবনের জন্য সেই মোহের কবলে পরে '। যাইহোক , কেউ ভুলেও কৌতূহল দেখতাম না , একটু ভয়ই পেতাম , ঠাট্টা -ইয়ার্কিতে গলিটার কথা এলেও , ও মুখো হওয়ার স্পর্ধা আমাদের কোচিং এর কারো ছিলোনা। আমার মনে একটা খটকা কৌতূহলের ছদ্দবেশে বাসা বেঁধেছিলো - নষ্ট মেয়েরা নষ্ট হয় যাদের জন্য , তারাই তাদের ভোগ করে , কিন্তু তাদের কেন নষ্ট ছেলে বলা হয়না ? পড়তে যাওয়ার সময় কতো বড়ো বড়ো গাড়ি দেখেছি , যেই গাড়িতে টেনে তোলা হতো নানা বয়সী নষ্ট মেয়েকে , কখনো বা গাড়ি থেকেই কোনো সভ্য বাবু নামতো - কোনো এক নষ্ট মেয়ের আদর খেতে। সবই দূর থেকে ঝাপসা দেখা এক নিছক কল্পনা হওয়ায়, একটা অদৃশ্য জানার ইচ্ছা আমায় তাড়া করে বেড়াতো। ঠিক করেছিলাম কলেজ এ উঠে একটাবার ঐ গলিতে যাবোই যাবো। ঠোঁটে সদ্য ধরা সিগারেটের মতোই সুকান্তের কবিতাটাও বারেবারে আওড়াতাম -"আঠারো বছর বয়স কি দুঃসহ ,স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি " !


যেমন ভাবা , তেমনি কাজ। কলেজে উঠে একটু বড়ো হয়েছি বোধ জন্মানোর সাথে সাথেই চলে গেছিলাম একদিন সেই নিষিদ্ধ পল্লীতে।

মনে মনে অনেক সাহস নিয়ে গেলেও গলির মুখ থেকে আর সামনে যেতে সাহস হচ্ছিলোনা। তখন মনে হয়েছিল কেন এই মূর্খের মতো কাজটা করতে গেলাম। পতিতাদের ভিড়ে মিশে আমিও নিজের পতন ডাকতে চললাম নাতো ? না না। ...তা কেন হবে ? আমি তো খোঁজ খবর সঞ্চয় করেই ফিরে যাবো। এরকম নানা উদ্বেগের সমান্তরালে আমার পায়ের পাতা গুলো মাটি স্পর্ষ করছিলো। আর বারবার কে যেন কানে কানে বলছিলো -" মাটিতে মিশে যাবি , নষ্ট হয়ে যাবি ,গিলে খাবে ওরা ,ওদের শরীরে বিষ " .......যেই মুহূর্তে বুঝলাম ওটা নিজের মনেরই আত্মকথনঃ ,তৎক্ষণাৎ কে যেন আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো একটা অন্ধকার ঘুপচি ঘরের দিকে। চিৎকার করার অবকাশ নেই , কুঠুরি ভর্তি নষ্ট মেয়েদের ভিড় , কিছু ঘর থেকে আসছে নানা রকম শরীর ভোগের বিকট শব্দ। হার হিম হয়ে গিয়েছিলো প্রায় , কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল - "সত্যিই আমি শেষ" ।


ধুপচি ঘরটার চারিদিকে পর্দা টাঙানো , আচমকা নিজের বুকের হুকটা খুলতে খুলতে মেয়েটি বলে উঠলো - "একটু তাড়াতাড়ি লিবি , ইনেছিস সাথে কিছু, লাকি দিবো ?"

কানের মধ্যে ঝনঝন করে বিধলো কথাটা। চট করে পকেট থেকে ছোট্ট প্যাড আর পেন নিয়ে লিখতে আরম্ভ করলাম। মেয়েটি বেশ রেগে গিয়ে বললো -"ইসব চালাকি চলবেক লাই কিন্তু ,তাড়াতাড়ি কাজ করে টাকা দিয়ে বিদায় হ দেখি ,বাকি খদ্দের অপেখ্যা করছে যে "...ততক্ষনে শাড়ির আঁচল খোলা হয়ে গেছে তার , ১৯-২০ বছরের যুবতীর ভরা যৌবন যেন ফুলের কেশরের উন্মুক্ত পরাগ রেণু। আমি অনুরোধের স্বরে বললাম - দয়া করে একটা বার আমার কথাটা শোনো , আমি তোমাকে ছোবোনা, তোমার সময়ও নষ্ট করে দেবোনা - তুমি ঘন্টা হিসেবে যা নাও তার দ্বিগুন পাবে , শুধু আমায় একটু তোমার গল্প শোনাও - কেন তুমি আজ এখানে ? অভাবের তাড়নায় ? নাকি এটাই তোমার মনের নেশা বা শরীরের খিদে - নষ্ট মনের নষ্টামী !

হেসে উঠলো মেয়েটা , না। .....ঠিক হাসি নয় , কেমন যেন হাসতে হাসতে বাঁধভাঙা জলের মতো কান্না ভেসে এলো কাজল পড়া সুন্দর চোখ দুটো থেকে। মাথায় হাত রেখে বলেছিলাম , আঘাত দিয়ে থাকলে ক্ষমা চাইছি , কিন্তু তোমার জীবন প্রবাহ এখানে এলো কি ভাবে সেটা না জেনে কিন্তু ছাড়বোনা তোমায়।


চোখের দিকে অনেক্ষন তাকিয়ে ছিল আমার। তারপর বলেছিলো -'তোর চোখে পাপ লাই রে বাবু , বলবো তোরে সব কথা আজ - বস কেনে '..

শুনলাম মেয়েটির নাম ছিল খুশি , মায়ের দেয়া নাম। এখন অবশ্য লোকে ওকে চেনে 'পাপড়ি রানী' নামে। যাইহোক খুশিরা ছিল তিন বোন। টগরী ,লালী , আর খুশি। কিন্তু , মজার বিষয় হলো খুশি হওয়ার পর কেউ আদেও খুশি হয়েছিল বলে মনে হয়না। মর্মান্তিক এক ঘটনা ঘটেছিলো সে হওয়ার পর - একটা না , একে একে দু দুটো ঘটনা। যেই ঘটনা গুলো কে মর্মান্তিক বললেও কম বলা হবে।


খুশি যখন হয় , টগরীর তখন বিয়ে হয়ে গেছে। হাঁ , ওদের গ্রামে ১১ বছরেই বিয়ে হয়ে যেত সকলের। আর লালীর জন্য পাত্র দেখা চলছে , বয়স ৯ হবে। বাড়ির সকলের সাথে তাদের বাবাও চন্ডাল মূর্তি ধারণ করে ওদের মায়ের উপর। অপরাধের কারণ তৃতীয় সন্তানও মেয়ে হওয়া।

গ্রামে রোটে যায় ওদের মা ডাইনি , সংসারের প্রদীপ জ্বালবে কে ? বাপ্ ঠাকুরদাকে মুখাগ্নী করারও তো কোনো ছেলে রইলো না , এই মহিলা নির্ঘাত ডাইনি - মুখে মুখে সবার এটাই রটতে থাকে।

ব্যাস , গ্রামীণ মাতব্বর দের বিধান মতো ওদের মা' কাজরী দেবীকে উলঙ্গ করে গোটা গ্রাম ঘুরানো হয়। এখানেই শেষ নয়। বাড়ির বৌ এর শ্লীলতা গেছে এই অপবাদে পরের দিনই পুড়িয়েও মারা হয় তাকে।


অসহায় খুশি তখন দিন চার -পাঁচেক এর হবে ! যাইহোক ,লাথি -ঝ্যাঁটা আর কুড়িয়ে পাওয়া উচ্ছিষ্ট খেয়ে কোনো ক্রমে ১০টা বছর পার করে খুশি। আসে পাশের প্রতিবেশীরা যে সময়ে তার বিয়ের পাত্র দেখার কথা বলতে আরম্ভ করে , সে সময় ফন্দি আটতে থাকে খুশির সৎমা।

স্বামীকে বোঝাতে সক্ষম হয় সে - 'যে মেয়েটার জন্য তোমার জীবনটাই শেষ হয়ে গেলো , তার মতো অলুক্ষুনে মেয়ের একটাই গতি হয় উচিৎ -"পতিতালয়" ....' . ..হুম , প্রায় ২৫ হাজার টাকা দিয়ে ১১ বছরের কিশোরীকে বিক্রি করে দিয়েছিলো তার বাবা ই। ..অলুক্ষুনে , ডাইনির মেয়ে শরীর বেঁচে খাবে ,এটাই তো স্বাভাবিক ! এর পর থেকেই খুশির জীবন প্রবাহের ধারা বইতে থাকে এই ঘুপচি ঘরের চার দেয়ালে। কত বাবু কত

ভাবে ভোগ করে তাকে , কতজনের আবদার থাকে অত্যাচারের মাধ্যমে নিছক একটু চোখের জল দেখার। কখনো নাকি তার শরীর নিয়ে একাধিক বাবু একসাথে মত্ত হয়ে ওঠে , তাতে বেশি পয়সা আসে - হ্যা চিৎকারও। বিকৃত রুচির বিকৃত রূপ , কিন্তু একটা কথা কিন্তু বেশ অবাক করেছিল আমায় - এই ডাইনির মেয়ে হওয়া , অলুক্ষুনে হওয়া ইত্যাদি পাপ গুলো ওর বাবু গুলোর গায়ে লাগেনা তো আবার !! ?


.....আজ ,পুরোনো সেই সেই প্যাড টা খুঁজে পাওয়ায় দমকা একটা ঝড় অনুভূত হলো মনের ভিতর। সত্যিই তো আজও উত্তর খুঁজে পাইনি - -

> "কোন মঙ্গলের ছদ্দবেশে মানুষ দিনের পর দিন খুশিদের জীবনকে পতিতালয়ে পাঠাবে ? "

> "কোন মহাপাপে আজও কন্যা সন্তানের মায়েরা ডাইনি হয়ে যাবে ?" - -উত্তর কারো জানা থাকলে জানাবেন !

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2015-2016 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.