তিলোত্তমা 




মেয়েটা যখন জন্মেছিল , ওর মিষ্টি মুখ আর কাঁচা সোনার মতন গায়ের রঙ দেখে বাবা ভালোবেসে নাম নাম রেখেছিল , 'তিলোত্তমা' । মেয়েটার রুপ দেখে পাড়া পরশি থেকে আত্মিয় স্বজন সবার মুখে একটাই কথা , " মল্লিক বাড়ির সেরা সুন্দরী হল তিলোত্তমা ।" ছোট থেকেই ওর মিষ্টি মুখ আর মিষ্টি স্বভাবের জন্য সকলের খুব প্রিয় , খুব মনের কাছের এই মেয়েটা।


আর শুধু রুপ তো না , এই মেয়ের গুণেরও তো শেষ নেই । পড়াশোনায় যেমন ব্রিলিয়ান্ট , সেই রকম সুন্দর নাচ করে । যখন ওর ক্লাস ফাইভ , তখনই ওর মা ওড়িশি নাচের ক্লাসে ভর্তি করে দিয়েছিল মেয়েকে । তিলোত্তমা যখন ঘুঙুর পরে নাচের তালে নিজের শরীরটা কে দুলিয়ে দেয়, তখন যেন ওকে স্বর্গের অপ্সরার মতন দেখতে লাগে !


এখন তিলোত্তমার বয়স ১৮ । মাধ্যমিকে স্টার পাওয়ার পর উচ্চ মাধ্যমিক আর জয়েন্ট এ ও দারুন রেসাল্ট করে এখন ও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ এর ছাত্রী । বেশ সুন্দর তাল আর ছন্দে চলছিল তিলোত্তমার জীবনটা । কলেজ শুরুর দিন থেকেই আবির এক গোছা বসন্তের রঙ নিয়ে ওর জীবনকে রাঙিয়ে দিয়েছে । জীবনটা যেন একটা স্বপ্নের মতন লাগে এখন ওর ! অদ্ভুত একটা ভালো লাগা ঘিরে থাকে ওর মনে...
কিন্তু স্বপ্ন একদিন বাস্তবের মাটিতে ধাক্কা খেল হঠাৎ । জীবনের সুন্দর তাল আর ছন্দটা কেটে গেল এক মুহূর্তে । তিলোত্তমা সেই বার দুর্গা পুজর উদ্বোধনি অনুষ্ঠান এ পাড়ায় নেচেছিল । ওড়িশি নাচের তাল আর ছন্দে ওর শরীর দেখে মুগ্ধ হয়েছিল সেদিন দুটো লোভী চোখ । সেই চোখ ওকে রাস্তায়, কলেজে, বাড়ির সামনে সব সময়ই নজরে রাখত । সুযোগ বুঝে ফোন নাম্বার যোগার করে নংরা মেসেজ পাঠানো থেকে মাঝরাস্তায় বাইক দাঁড় করিয়ে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দেয়া , সবই করত নিয়ম মেনে । তিলোত্তমার দিনের ২৪ টা ঘণ্টা কাটতো একটা ভয়ে , এই বুঝি সেই নোংরা আর লোভী চোখ দুটো ওর সামনে চলে আসবে , যেমন সেইদিন হঠাৎ ঝড়ের বেগে বাইক চালিয়ে এসে ওর বুক ছুঁইয়ে গিয়েছিল , বাড়ির সামনের ফাঁকা গলিটায় রাত্রিবেলা পড়া থেকে ফেরার সময় একা পেয়ে ওর হাত টেনে নিয়ে গাল টিপে দিয়েছিল ! এখন তো রাস্তায় একা বেরোতে , কলেজ যেতেও যেন ভয় লাগে ওর । বাবা সব শুনে বহু বার পুলিশ স্টেশন এর দরজায় গেছে, কিন্তু ওরা কিছুতেই কমপ্লেন নেয়নি । এই ছেলের বাবা শহরের বিশাল বড় পলিটিশিয়ান ! তাই যা ইচ্ছে তাই করার অবাধ স্বাধীনতা এই দেশ আর তার অসাধারন আইন ব্যাবস্থা ওকে দিয়েছে । ওর এগেনষ্টে রিপোর্ট এই শহরের কোন পুলিশ স্টেশনই তাই নেবে না ।


আসতে আসতে দিন এগোতে থাকলো আর ছেলেটার সাহষ ও বাড়তে থাকল । তিলোত্তমা এখন ওর কাছে একটা জেদ , যাকে যে কোন ভাবেই নিজের করতে হবে । এই সব ভেবেই সেইদিনও কলেজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো , তিলোত্তমা কলেজের গেট থেকে বেরোতেই ওর হাতটা জোর করে চেপে ধরল , কিন্তু সেদিন আবির ওর সঙ্গে ছিল, তাই ছেলেটা আর কিছু করার আগেই আবির ওকে সপাটে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিল । কলেজের সামনের ভিড় টা এখন ছেলেটার দিকে তাকিয়ে । অপমানে ওর গালটা এখন লাল , চোখে রাগ । সেদিন আর ছেলেটা কোন কথা বলেনি, চুপচাপ বাইক নিয়ে চলে গিয়েছিল । এরপর তিন সপ্তাহ আর ছেলেটাকে তিলোত্তমা দেখতে পায়নি । ভেবেছিল সেইদিনের ঘটনায় ছেলেটার বেশ একটা শিক্ষা হয়েছে হয়ত ! আর জ্বালাতে আসবে না তাই । বেশ খুশি ছিল ওর মনটা । সেইদিনও হাঁসি মুখেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল কলেজ যাবে বলে ! কিন্তু জানত না মাঝ রাস্তায় পথ আটকে বসে আছে সেই ছেলেটা , তাই আর আজ কলেজ যাওয়া হবে না । সেইদিন যদিও ছেলেটা হাত ধরেনি, ফ্লাইং কিস ও ছোরেনি ! তার বদলে চলন্ত বাইক থেকে অ্যাসিড ছুড়েছিল ওর মুখে । কয়েক মিনিটের মধ্যে তিলোত্তমার সুন্দর মিষ্টি মুখটা জ্বলে শেষ হয়ে গিয়েছিল । চামড়া গলার জ্বালা সজ্য করতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পরেছিল তিলোত্তমা । জ্বলন্ত অ্যাসিড শুধু ওর মুখেই না, হাতেও লেগেছিল । 'মল্লিক বাড়ির সেরা সুন্দরী' , ম্যাডিকাল কলেজ এর স্টুডেন্ট, ওড়িশি নর্তক শিল্পি , মা বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে , আবিরের জীবনের একমাত্র ভালবাসা আজ মাটিতে লুটিয়ে পরে যন্ত্রণায় ছটফট করছে । একটা সুন্দর ১৮ বছরের মেয়ের জীবন রাস্তার দোকান থেকে মাত্র ত্রিশ টাকা দিয়ে কেনা এক বোতল অ্যাসিড এক মুহূর্তে শেষ করে দিল ।


সেইদিনের পর ৬ মাস তিলোত্তমা নার্সিং হোমে ভর্তি ছিল , ওর মা বাবা প্রথম হসপিটাল এ ওর মুখটা দেখে আঁতকে উঠেছিল ! আবির তো তিলোত্তমার গলায় ঝোলানো ওর দেয়া চেন টা দেখে বিশ্বাস করেছিল এই সেই মুখ, যাকে একবার দেখেই কোন একদিন ও ভালবেসেছিল ! নার্সিং হোমের বার্ন ওয়ার্ডে বার বার শোনা যেত সেই তিলোত্তমার চিৎকার , যন্ত্রণায় শুধু ওর শরীরটা জ্বলত না, জ্বলত ওর মন, পুড়ত ওর অস্তিত্ব , ওর সত্তা ।
এই ছ মাসে কোর্টে কেস যদিও উঠেছিল, তবে দুটো হিয়ারিং এর জন্য । সেই নামি পলিটিসিয়ান এর ছেলেকে একদিনের জন্য ও জেলবন্দি হতে হয়নি । স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক সে এখন । বুক ফুলিয়ে রাস্তায় ঘাটে ঘুরে বেরায় সে । বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যায়, পার্টি করে !


আর তিলোত্তমা আজ ঘরবন্দি । আয়নার সামনে যেতেও আজকাল যেন ভয় করে । সব সময় বাইরের লোকেদের সামনে বেরোয় ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে । যেন নিজের লোক , বাইরের লোক সবার থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখার একটা অদ্ভুত চেষ্টা করে যায় ও প্রত্যেকটা দিন । হাঁসিখুশি তিলোত্তমা আজ একেবারে চুপ, নিঃসঙ্গ ঘরের দেয়ালগুলই এখন ওর সঙ্গি । সেই কলেজ, ক্লাসরুম, বন্ধুদের সাথে আড্ডা , নাচ প্র্যাকটিস , আবিরের সাথে হাজারো কথা আজ যেন শেষ । একটা ত্রিশ টাকার অ্যাসিড এর সত্যি অনেক ক্ষমটা , একটা ফুলের মতন জীবনকে কেমন কয়েক সেকেন্ড এর মধ্যে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিল ! এখন চারিদিক এ একটা ঘন দম বন্ধ করে দেয়া অন্ধকার , তিলোত্তমার রঙিন জীবনটা আজ কালো ।
কিন্তু সেদিন হঠাৎ ওর কালো অন্ধকার জীবনে এক মুঠো রং ছরিয়ে দিল আবির , কলকাতার একটা এনজিওর সাথে তিলোত্তমার মা বাবার যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে ! তারা তিলোত্তমার পুরো ঘটনা জেনে সাহায্যের হাত বারিয়ে দিয়েছে ওর দিকে । দিল্লির এক নামি হসপিটাল এ প্লাস্টিক সার্জারির ব্যাবস্থা করে দিয়েছে । ডক্টর দেব মালহত্রার আন্ডারে শরিরের বিভিন্ন অংশের চামড়া কেটে ওর মুখটাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ১৫ বার ছুড়ি কাঁচি চালাতে হয়েছে তিলোত্তমার মুখে । প্রায় এক বছর ধরে দিল্লির হসপিটাল এর পাঁচ নম্বর কেবিনটাই ছিল ওর ঠিকানা । এই সময়টায় বার বার ওর চোখের সামনে ভেসে উঠত , ওর সেই চেনা ঘর, বারান্দা , বাড়ির সামনে থেকে চলে যাওয়া রাস্তাটা , কলেজ ক্যাম্পাস , আবিরের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো । মাঝে মাঝে মনে হত , আর হয়ত ফেরা হবে না ওর সেই চেনা জীবনটাতে , চেনা মানুষ গুলোর কাছে ! ওর সুন্দরী হয়ার , একটা ছেলেকে 'না' বলার মুল্য দিতে হবে হয়ত নিজের জীবন দিয়ে । কিন্তু তিলোত্তমা সেদিন বোঝেনি যে অদৃষ্ট অন্য কিছু লিখে রেখেছে ওর জন্য । প্রায় দের বছর পর সেদিন হসপিটাল এ আয়নার সামনে নিজের হারিয়ে যাওয়া মুখ টা কে যখন খুঁজে পেল , সেদিন বুঝল , হেরে যাওয়ার জন্য ও তৈরি হয়নি , লড়াই করে বেঁচে থাকার জন্যই এই জীবনটা পেয়েছে ও ।


সেদিন থেকে একটা জেদ চেপে গিয়েছিল ওর মনে, লড়াই করে নিজের অস্তিত্বকে , নিজের সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার জেদ । কলকাতা ফিরে এসে তাই আবার শুরু করেছিল পড়াশোনা । দেড় বছর নষ্ট হয়েছে তো কি হয়েছে !, সারা জীবন তো হয়নি । তাই জীবনের বাকি সময় গুলোকে কাজে লাগাতেই হবে ওকে ।
তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তিলোত্তমাকে । সেই ঘটনার দশ বছর কেটে গেছে। আজ ওর পরিচয় ডঃ তিলোত্তমা হিসেবে, কোলকাতা শহরের একজন নাম করা প্লাস্টিক সারজেন ও । আজ ওর হাত ধরেই অনেক অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া জীবনগুলো নিজের হারানো অস্তিত্বকে খুঁজে পায় । শুধু তা ই নয় , তিলোত্তমা এখন একটা এন জি ওর সাথেও কাজ করে । অ্যাসিড এটার্ক ভিকটিম দের সব রকম ভাবে সাহায্য করার , পাশে থাকার চেষ্টা করে ও । এর মধ্যে নিজের পারসনাল লাইফটাকেও বেশ গুছিয়ে নিয়েছে যদিও। আবিরের সাথে বিয়ের এতগুলো বছর পরও সম্পর্কটা একেবারে বন্ধুর মতই ! দিনগুলো এখন আবার রঙিন , তাল , ছন্দ , আর একটা মিষ্টি সুরে বাঁধা ।
কিন্তু সেইদিন হঠাৎ একটা ঘটনা ওকে আবার দশ বছর আগে পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য । সেইদিন হসপিটাল এ রোজকার মতন রাত ৯ টার পর রাউন্ড দিতে এসে হঠাৎ জেনারেল ওয়ার্ড এর সাত নম্বর বেড এর পেসেন্ট কে দেখে পা টা থমকে গিয়েছিল । সেই ১০ বছর আগের মুখটা এখন ওর সামনে । যদিও সেই ছেলেটার আজ আর কোন সেন্স নেই ! , নিঃশ্বাসটা ও নিতে হচ্ছে একটা নলের সাহায্যে ।


যেই হাত দিয়ে ছেলেটা তিলোত্তমার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়েছিল , সেই হাতে আজ স্যালাইনের ছুঁচ বেঁধানো । দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা নিথর দেহ রাখা আছে সাত নম্বর বেড এ। আর চুপ না থেকে ও নার্সকে প্রশ্নটা করেই ফেলল , ----- " এই সাত নম্বর বেড এর পেসেন্ট এর কি হয়েছে ? আজ ই কি এডমিট হল ?''। নার্সটা নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল , ---- " আজ না, এ অনেক দিনের কেস ! দু বছর আগের একটা বাইক এক্সিডেন্ট এ সারা শরীরই প্যারালাইসিস হয়ে যায় । নার্ভ এর এমন জায়গায় লেগেছে যে এদেশ , বিদেশ কোন কিছু করেই কোন লাভ হয়নি । আর বাড়ির লোকই বা আর কত ঝামেলা পোয়াবে ! আর কতই বা টাকা খরচ করবে ! বেসরকারি নার্সিংহোমে তো টাকার খেলা। তাই এখানে ফেলে রেখে গেছে আজ । শুনেছি এর বাবা না কি পলিটিকাল নেতা ছিল খুব বড় , কিন্তু উনি মারা যাওয়ার পর এদের অবস্থা একেবারেই পরে গেছে । "
কথাগুলো শুনে খুব অদ্ভুত লাগছিল তিলোত্তমার ! যেই ছেলেটা একদিন ওর পুরো জীবনটাকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল , যার জন্য ওর জীবনের দেড়টা বছর কেটেছিল হসপিটালের কেবিনে ! সে আজ নিজের হাত টুকুও নাড়াতে পারে না নিজের ইচ্ছায় ! তার পুর শরীরটা আজ যেন একটা শক্ত ভারি পাথর ! হঠাৎ মনে হল , ফেরৎ প্রত্যেকটা মানুষকে পেতে হয়, কারোর আগে, আর কারোর কিছুদিন পরে । এই পৃথিবীর আদালত ওকে বিচার না দিতে পারলেও , সবার ওপরে যেই আদালতটা আছে , সে ওকে ন্যায় দিয়েছে । একদিন যেই ছেলেটা ওকে পুড়িয়ে শেষ করে দিতে চেয়েছিল , আজ সে প্রত্যেকটা দিন জীবন যন্ত্রণায় পুড়ছে। যেই যন্ত্রণার আর কোন মুক্তি নেই !

===========================================================

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.