একটা ন্যাকা থুরি থুরি ব্যাঁকা প্রেমের গপ্প


 

সারাটাদিন ধরে গাধার মতো খাটা-খাটনি করে সন্ধ্যেবেলা ঘরে এসে বসতে না বসতেই শুভ’র মা নিজের ফাটা রেকর্ড টা যথারীতি চালু করে দিলেন। মাঝে মাঝে শুভ’র মনে হয় সারাদিন মৌনব্রত পালন করে মা বুঝি তার ঘরে ফেরার অপেক্ষাতেই থাকেন! কখন ছেলে ফিরবে আর উনি বকা শুরু করবেন। পাড়ার লোকেরা প্রায়শই ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, বোঝার চেষ্টা করেন ব্যপারটা ঠিক কি ঘটে? এই তো আজকেই এক্ষুনি অফিস থেকে ফেরার পথে পাড়ার সব থেকে গোবেচারা হরিপদবাবু পর্যন্তও ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি রে? সারাদিন তোর মায়ের টু-শব্দটিও পাওয়া যায় না আর যেই তুই ঘরে ঢুকিস ওমনি বকতে থাকে! তুই কি মায়ের ওপর কোন মানসিক নির্যাতন-টাতন…’। শুভ সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে তাকাতে উনি নরম হয়ে যান সঙ্গে সঙ্গে।  

 

‘না না, এটা শুধু আমি ভাবছি না কাল পল্টুর চায়ের দোকানে এটা নিয়ে রীতিমত শোরগোল হচ্ছিল কে কোথায় ক’টা এমন ছেলে দেখেছে যে বাইরে ভদ্রবেশীর মুখোশ পড়ে লোকের সামনে ভালোমানুষী দেখিয়ে বাড়িতে নিজের বাবা-মা কে অত্যাচার করে। তখনই কে যেন একটা তোলে তোর কথা। না না, তুই যা ভাবছিস তা নয়, আমি তো সঙ্গে সঙ্গেই বললাম, আমাদের শুভ’র মতো ছেলেই হয় না। ও কি করে এমনটা করতে পারে। ছেলেবেলায় ওকে আমি পড়িয়েছি, আমি জানি না, ও কেমন। আর ঠিক তখনই পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তোর বাবা। তা তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হল, কি নিয়ে এই ঝামেলাটা হয়? কি বললেন জানিস, বললেন, আমি কানে তুলো আর পিঠে কুলো দিয়ে দিই সন্ধ্যাবেলা ছেলে ঘরে ঢুকলেই। তাই আমি ঠিক বুঝতে পারি না ওরা কি নিয়ে কথা বলছে, দেখি দু’জনের ই শুধু ঠোঁট দুটো সমান তালে নড়তে! এর বেশী আমি কিচ্ছু জানি না।’ এতক্ষণ ধরে তোড়ে কথা বলে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ খেয়াল করলেন শুভ কেমন নিস্পলক ভঙ্গীতে তাঁর দিকে চেয়ে আছে। বুঝি সেই দৃস্টিতে এমন কিছু ছিল, যা দেখে তাঁর মতো বেআক্কেলে মানুষও বুঝে গেলেন বড় বেশী বর্ণনা করে ফেলেছেন ঘটানার এতোটা না করলেও চলত আর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ঠোঁট চাটতে চাটতে, ‘আচ্ছা! এখন আসি কেমন। তোমার কাকিমা আবার অপেক্ষা করে রয়েছেন, আজ আবার একটু চুনো-মাছ কিনে ফেলেছি এমন অসময়ে সন্ধ্যাবেলা! এমনিই আঁশ-বটি দিয়ে আমায় ছাড়িয়ে দেবে, বেশী দেরী করলে আর আমায় খুঁজে নাও পেতে পারো। 

 

পাড়ার মোড়ে তাদের নিয়ে এসব আলোচনা হয় শুনে প্রথম থেকেই শুভ’র মাথাখানা গরম হয়েছিল। আর সেই আজকেও খেটে খুটে ঘরে ঢুকে কিচ্ছু না, সামান্য এক গ্লাস জল চেয়েছে মায়ের কাছে! ব্যস, আর যায় কোথায়,ওমনি ফাটা রেকর্ড চালু হয়ে গেল মায়ের!“ আর পারি না বাপু, আমি ভূতের বেগার খাটতে। সারাটাদিন আমি একা! আমিই একা কাজ করে যাচ্ছি, কেউ নেই যে শুধু মুখ তুলে আমার দিকে চেয়ে বলে, আহা! তুমি একা আমাদের জন্য এত পরিশ্রম করছ! তোর বাবা তো সারাদিন মুখ গুঁজে হয় কাগজ পড়ছে নয় মাথায় হেড-ফোন গুঁজে যত রাজ্যের ভূতেদের গান শুনে যাছে! আমারও তো ইচ্ছা করে কারো হাতে সেবা পেতে, এই যে তুই কষ্ট করে অফিস করে এলি, এই বুড়ি মায়ের হাত থেকে জলটা না নিয়ে যদি একটা কচি মেয়ের হাত থেকে জলটা নিতিস তোরও কি আরও ভালো লাগত না, সত্যি করে বল তো দিকি...”

 

“এই এই! নিবে,নিবে…এমন বলো না চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে, লোকে পাগল বলবে। বড়ে গোলাম আলির, ছোটে গোলাম আলি এদের গান, ভূতের গান! নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছ, করো না! আজ সারাদিন ধরে কি রফা হল? এর মধ্যেই ভুলে মেরে দিলে? এমন করলে কিন্তু আমি খেলব না! শুধু ওর প্রতি কনসেনট্রেট কর।” কানে হেডফোন গোঁজা অবস্থায় তাল ঠুকতে ঠুকতে জবাব দিলেন মাল্টিটাস্কার পুরুষোত্তম বাবু।

 

“হ্যাঁ! এই বুড়ো বয়সেও কি ধাড়ি ছেলের হাতে গ্লাস পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব শুধু আমার একার? যার দায়িত্ব এবার তাকে আনা হোক! ঠিক কিনা…”

সবিস্ময়ে শুভ দেখল মঝঝিম পন্থী বাবাকেও মা নিজের ট্র্যাকে নিয়ে চলে এসেছে…বাবা মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে ঠিক হীরক রাজের সভাসদের মতো বলে চলেছেন, “ঠিক ঠিক!”বাহ! কি সুন্দর সানাইয়ের পোঁ গাইছে তো। ঝগড়ার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকার জন্য তার এই নির্বিরোধী বাবাকে দিয়ে ওর মা যে আর কি কি করাবে কে জানে মনে মনে ভাবল শুভ!কাউকে না চিনেই একটা দৃশ্যের মধ্যে পাঠক ঢুকে পড়েছিলেন। আসুন, একটু আলাপ পরিচয় করে নিন, চরিত্রদের সঙ্গে।

 

 

শুভম চ্যাটার্জী ওরফে সব্বার শুভ, ইলেকট্রনিক্সে এম.এস.সি. করে একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করেছে এই বছর দু’য়েক হল। কোম্পানির মালিক অন্যান্য সাধারণ মালিকদের মতো খরুশ নয়! বেশ ভালোই বলা যায়, স্টাফদের যত্নে রাখার ওপর তাঁর অনেক ভাবনা, লোকে যেন কোম্পানিকে ভালোবেসে কাজ করে। তাই সক্কাল সক্কাল উঠে বাদুড়ঝোলা ভাবে উল্টোডাঙা ষ্টেশনে নেমে কোম্পানির বাসটাতে বডিটা ফেলে দিতে পারলেই হল, শান্তি শান্তি। তারপর ওখানেই জলখাবার খেয়ে কাজে লেগে যাও। দুপুর বেলা বিকেল বেলা সমস্ত খাবারের দায়িত্ব কোম্পানির ঘাড়ে, নিছক দিন-প্রতি কুড়িটি টাকার বিনিময়ে। কাজের চাপ সব জায়গাতেই আছে, এখানেও আছে, কিন্তু তার বদলে তারা যা পেয়ে থাকে তাতে তারা খুব নিশ্চিন্ত।

 

হ্যাঁ, নিশ্চিন্ত! শুভ’র মা ও ক’বছর খুউউব নিশ্চিন্ত ছিলেন। টেনশন করাটা ওনার প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ওর ছোট্ট-বেলা থেকেই যখনই মা বুঝলেন ছেলের আর পাঁচজনের থেকে মাথা ভালো তখন থেকেই সেই টেনশন। ঈশ্বর যখন দিয়েইছেন, সেই মাথা খাটিয়ে যাতে ছেলে দশ’জনের এক’জন হতে পারেন সেদিকে সদা-সতর্ক লক্ষ্য তাঁর। এতদিনে সে টেনশন মিটেছে ছেলে তাঁর মন মতো কাজ পেয়েছে।

 

কিন্তু ঐ যে, তিনিও মা! নিশ্চিন্তে বসে থাকা তাঁর ধাতে নেই। টেনশন হচ্ছে না বলে, কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে না বলে তাঁর মাথাটা কেমন যেন ভার হয়ে আসতে লাগল। এখন একটা সুপার কম্পিউটার যে হাই-লোডে কাজ করত এত বছর, তাকে যদি হঠাৎ কোন কাজ দেওয়াই বন্ধ করে দেন সে তো ভুট-ভাট করবেই। হ্যাঁ! তা চিন্তাটা তিনি পেলেন, তাঁর বান্ধবীর ছেলের বিয়ে উপলক্ষ্যে কাজের জন্য তিনি সেখানেই থাকছিলেন ক’দিন। সংসারে আর অত চাপ নেই, ছেলেতো সারাদিন ধরে এত খায় এত খায় অফিসে যে রাতে ঠিক করে কিছু খায়ই না, কথা ছিল সেই ক’দিন পাড়ার দোকান থেকে বাপ-বেটা ক’দিন রুটি কিনে খাবে। তো সেই বিয়ের নানা কাজের মধ্যেই কেউ মজা করে বলেছিলেন, ‘কি রে সই! তোর ছেলে তো এখন মস্ত চাকরী করছে। এর পরই বিয়েটা লাগিয়ে দে, দেখ এখন গালে মেক-আপ টেক-আপ দু’দিন ধরে ঘষলে তাও তোর হ্যান্ডসাম ছেলের জেঠিমা লাগব আমরা, যা জেল্লা দিচ্ছে এখন তোর ছেলের স্কিন দিয়ে! আর ক’বছর পর তো মেয়ের বাড়ির লোকেরা আমাদের দেখিয়ে বলবে এরা কি সব পাত্রের জেঠী-শাশুড়ি হন! তখন কিন্তু আমরা তোকেও ছেড়ে কথা বলব না হ্যাঁ, এই বলে রাখলাম। ব্যাস, তিনি চিন্তা করার একটা ইস্যু পেয়ে গেলেন। ছেলেটা এত ভালো চাকরী করে কে কখন গলা ধরে ঝুলে পড়বে, তারপর সারাজীবন ধরে জেরবার…তার থেকে তিনি নিজে ভালো পাত্রী পছন্দ করবেন, কিন্তু তিনি পাত্রী পছন্দ করতে পারেন, বিয়ের সব ব্যবস্থা একা হাতে করতে পারেন কিন্তু বিয়েটা তো ছেলেকেই করতে হবে রে বাবা! সে ছেলে এখন বিয়ে করতে রাজী নয় কিছুতেই যে।

 

ছেলের বক্তব্য, আমার মোটে এখন আঠাশ পেরোল, এই বয়সেই যদি গলায় একটা ফাঁস পড়ে নি, তবে জীবনটা উপভোগ করব কবে? এতদিন বাবা পড়াশোনা কর, জীবনে কিছু করতে হবে, মাথা উঁচু করে চলতে হবে এসবের জেরে ক্লাস সেভেন-এইট থেকেই খেলা-ধূলা আড্ডা মাথায় উঠে গিয়েছিল। ওর বাবাও এই বিয়ের ব্যাপারে ওর দিকেই ঘাড় কাত করায় শুভ আরও জোর পেয়েছে। তাই মা যত জোর করেন ছেলে বলে, তুমি বাবার ওপর জোর দেখাও বলে আমার ওপরেও জোর দেখাবে, শুনব না! তোমার কোন কথা শুনব না এতদিন অনেক শুনেছি, আমারও জেদ আছে। তখন থেকেই মায়ের সন্দেহ, ডাল মে কুছ কালা জরুর হ্যায়। নিশ্চয় কোন মেয়ের প্রেমে পড়েছে আর তাই তাঁর শান্ত সুবোধ মায়ের আঁচলের তলায় থাকা ছেলেটা এমন উল্টোপাল্টা আচরণ করছে।

 

ছোটবেলায় হলে কোন ব্যপারই ছিল না, ছেলের কিছু ভালো বন্ধুদের তিনি ফিট করে ফেলেছিলেন যারা তাঁর কাছে শুভ’র যে কোন গণ্ডগোলের খবর পৌঁছে দিত, কিন্তু এই অফিসে তো আর সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর যে জানার খুব দরকার, কারণ কিছুদিন আগে হঠাৎ রাস্তায় স্কুলবেলার এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তা সেই বান্ধবী তো কিছুতেই ছাড়বে না, এতদিন পর দেখা, একটু প্রাণ খুলে কথা বলবেন না। কাছেই তাঁর বাড়ি আর সেখানে তাঁকে যেতেই হবে। সত্যিই ঈশ্বর পরম দয়াময়, হয়তো যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে দরজা খুলে দিল তাঁর মেয়ে, দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আহা! এই তো সেই আধুনিক মা লক্ষী! একে যদি ঘরের বৌ করা যেত। কথা বলতে বলতে জানা গেল মেয়ে শুধু লক্ষীই নয়, একই অঙ্গে সরস্বতীও বটে! সরকারি কলেজ থেকে ইলেকট্রিকাল ডিপ্লোমা পাশ করে এখন একটি বেসরকারি কোম্পানিতে খুব ভালো পদে কাজ করছে। মা বান্ধবীর বাড়ি থেকে চলে তো এলেন কিন্তু মন পড়ে রইল ঐ মেয়ের কাছে ! ইসস! যদি অমন মেয়েকে ছেলের বৌ করা যেত, আহা, যেমন রূপ তার তেমন গুণ আর সবথেকে বড় যেটা একটুও অহংকার নেই!তারপর থেকেই মা পুরো বদলে গেলেন, ফিরে এলেন তাঁর আগের রূপে। সারাক্ষণ ছেলের সঙ্গে খিটির খিটির আর দেখা হলেই শুধু একটাই কথা, বিয়ে কর বিয়ে কর আর বিয়ে কর। কিন্তু ছেলেটাও তো তাঁরই, তাই সেও মহা সেয়ানা, কিছুতেই কোন মীমাংসায় পৌঁছতেই পারেন নি তিনি, যে ছেলে প্রেম আদৌ করে কি করে না!

 

আজ একটা হেস্ত-নেস্ত তিনি করেই ছাড়বেন, এমনভাবে ছেলের সঙ্গে দিনের পর দিন বিয়ে নিয়ে ঝগড়া চালাতে থাকলে সেটা হিতে বিপরীত হতে পারে, হয়তো ছেলে সাধু হয়ে হিমালয়ে চলে গেল কি কাউকে ধরে এনে বলল নাও মা, তোমার বৌমা, তোমার খুব শখ তো তাই রাস্তা থেকে ধরে আনলাম।

 

তাই আজকের ফল পেতে গেলে শুভ’র বাবা কেও নিজের দলে টেনে আনতে হবে। ছেলে যেন বাবার সমর্থন কোনভাবেই আর না পায়। শুভ’র ভালো মানুষ বাবা উনি বেচারা সাতেও নেই পাঁচেও নেই, পোস্ট বিভাগ থেকে বছর দু’এক হল তিনি রিটায়ার করেছেন, তারপর তাঁর শখ হল ঐ সকাল বেলা উঠে কাগজ পড়া আর তারপর যত পুরানো দিনের গান শোনা।  কিন্তু শুভ’র মা, নিবেদিতা চ্যাটার্জী মনে করেন, যারা সাতে-পাঁচে থাকেন না তাঁরা অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে থাকেন কারণ তাঁরা অবশ্যই ছয়ে থাকেন। এমন ধরনের মানুষরা কখন যে বিক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে অনুঘটক হয়ে বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত বা মন্দীভূত করে বসবেন সে তাঁরা নিজেরাও জানান না। তো সেইদিন সকাল বেলা দু’জনের মধ্যে চুক্তি হল পুরুবাবু ছেলের পক্ষে কোন কথা বলবেন না কিন্তু তাঁকেও ঠেস দিয়ে কোন কথা বলা যাবে না। চুক্তি-টুক্তি করে তিনি খানিক রান্নার একটা পদ নিয়ে চললেন হরিপদ বাবুর বাড়ি ষড়যন্ত্র করতে, ওই পরিবারের সঙ্গে এই পরিবারের খুব সখ্যতা। বাবা-মা ছাড়া পাড়ায় একমাত্র হরিপদবাবুকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে শুভ, হবে নাই বা কেন উনি ছিলেন শুভ’র একেবারে ছোট বয়সের বিজ্ঞানের স্যার।

 

 

 

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2015-2016 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.