শয়তানের ত্রিভুজ



আজকের দিনটা গুরপ্রীতের কাছে খুবই আনন্দের। ও নাচতে নাচতে বাড়িতে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। মা আমি পেরেছি, আমি পেরেছি। আমার এতো দিনের স্বপ্ন ইউ।এস। বিমান বাহিনীর পাইলট হওয়ার তা আজকে সফল হলো। আজ আমি খুব খুশী মা. ওর মায়ের মুখটা কিন্তু খুব একটা উজ্জ্বল হল না। কতো করে উনি ছেলেকে বুঝিয়েছিলেন, বাছা পরিবারের বড় ব্যবসা রয়েছে তুই দোকানে আয়। বাবা কাকার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্যবসাটাকে আরও বড় কর। তা না ছেলের সেদিকে কোন টান থাকলে তো! ছেলের ছোট বেলা থেকে এক স্বপ্ন। সে পাইলট হতে চায়। বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও এই প্রতিযোগীতায় একবার সে লিখেছিলো বড় হয়ে প্লেনের পাইলট হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে আলবাট্রস পাখির মতো দিনের পর দিন উড়ে বেড়াতে চাই। শাসন করতে চাই ওপরে থাকা ঈশ্বরের ঐ আবাস স্থলকে। কিন্তু কিছুদিন পরেই সে বুঝলো শুধুমাত্র যোগ্যতা দিয়েই কোন চার্টার্ড প্লেনের পাইলট হওয়া যায় না; তাকে অ্যাকাডেমি থেকে প্রথমে কমপক্ষে দুশো ঘণ্টার আকাশ ভ্রমণ থাকতে হবে তারপর তুমি কোন কোম্পানিতে আবেদন করতে পারো পাইলট হওয়ার জন্য। তারপর তারা টেস্ট নেবেন তুমি কিছু জানো কি জানো না। অতএব তার ভাবনা ওখানেই ইতি-গজ। ঘণ্টা পিছু গাদা গাদা ডলার খরচ বাড়ি থেকে জীবনেও করবে না, সেটা জানে গুরপ্রীত। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর পরিবারে সকলের মুখে হাসি ফুটিয়ে নিজেদের বন্দুকের দোকানে বসতে যাচ্ছিল প্রথম যেদিন ঠিক সেইদিনই বন্ধু মাইকেলের সঙ্গে ওর দেখা হয়ে গেল রাস্তায়। ওর আর দোকানে যাওয়া হল না। এয়ার ফোর্স যুদ্ধ-বিমানের পাইলটের জন্য ফর্ম-ফিলআপ করে জমা দিতে সে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত ভেবেছিল প্রীত তারপরেই বন্ধুর সঙ্গে গিয়ে বাড়ির কোন অনুমতি না নিয়েই ভরে দিয়ে এসেছিল ফর্ম। যেদিন পরীক্ষা দিতে যাবে সেদিন শুধু মাকেই জানিয়েছিল। কি হবে বেকার, গোটা বাড়ি মাথায় করে চিল্লাবে বাবা-কাকারা। পরীক্ষা দিচ্ছে তো অনেকেই তার মধ্যে কয়জনকে আর নেবে ? ভীষণ কঠিন পরীক্ষা শারীরিক-মানসিক দু’দিক থেকেই। তারপর যদি লেগে যায় তখন না হয় দেখা যাবে।


রাতের বেলা গোটা পরিবার যখন একসাথে এক টেবিলে বসে খাবার খায় তখন প্রীত সকলের সামনে এই কথাটা পাড়ল, এতদিনে তার স্বপ্ন সফল হয়েছে, সে বাড়ি থেকে অনুমতি চায় আগামী এক বছর তাকে ট্রেনিং সেন্টারে থাকতে হবে। মাত্র পনেরো দিন বাদেই শুরু হয়ে যাবে তার যাবতীয় ট্রেনিং। শুরুতে বাবা-কাকা অনেক গাঁই-গুই করেছিল, বলেছিল সুখে থাকতে শেষে ভূতে কিলালো? এরপর ইরাকে সিরিয়ায় পোস্টিং হবে; কবে ঘরে ফিরতে পারবি কবে পারবি না। তারা কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না। ছেলে ব্যবসা না করে এতো কঠিন একটা জীবন বেছে নিচ্ছে এটা যেন তাঁদের বিশ্বাস করতে মন করছে না কিছুতেই।


শেষ পর্যন্ত ওর ঠাকুরদা ধমক দিলেন নিজের ছেলেদের, বললেন জীবনটা ওর। ও যখন এতো করে বিমান বাহিনীতে যেতে চাইছে তখন বাধা দেওয়া কেন ? এক একজন মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার এক একরকম লক্ষ্য থাকতেই পারে কেউ সকাল-রাতে ভর-পেট খেয়ে রাজনীতির আলোচনায় মসগুল থেকে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে তো কেউ আফ্রিকায় সিংহের গুহায় ঢুকে বাচ্চাদের সঙ্গে সিংহীর ছবি তুলে নিজেকে ধন্য মনে করে। প্রত্যেকের অধিকার আছে নিজের নিজের মতো করে জীবনটাকে সাজিয়ে নেওয়ার। এতদূর এগিয়ে যাওয়ার পর ওকে আর বাধা দেওয়া যায় না বিশেষ করে সকলেই যখন জানো ছোটবেলা থেকেই প্রীত কি চায়। আমি তোকে অনুমতি দিলাম সেরা পাইলট হয়ে ফিরে এসে দাঁড়া আমার সামনে। আমি ইউ।এস। এয়ার ফোর্স পাইলটকে স্যালুট দিয়ে অভিবাদন জানাবো। যা, তুই।


পাইলট ট্রেনিং সেন্টারটা ঠিক যেন এক স্বর্গ। অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে ফ্লোরিডার এক দ্বীপে এটা অবস্থিত। প্লেন চালানো শেখানো হয় মহাসমুদ্রের ওপর; কি অসাধারণ যে দেখতে লাগে ওপর থেকে পৃথিবীকে সেটা দেখার মতো কপাল নিয়ে খুব বেশী মানুষ জন্মায় না আর জন্মালেও অনেকের চোখেই সেই সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। প্রীতের মন বড় সৌন্দর্যপিপাসু মাঝে মাঝে অপলক চোখে চেয়ে থাকতে থাকতে কোথায় যে সে হারিয়ে যায় কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না ওর স্যার ক্যাপ্টেন হুইটলার। এমনিতে প্রীত খুবই মনযোগী ছেলে কিন্তু কেমন যেন ক্ষ্যাপাটে।


আজ প্রীতের ভীষণ আনন্দের দিন। আজ ওকে একা যুদ্ধবিমান ওড়াতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য দিনের মতো আজ আর পাশে স্যার বসে নির্দেশ দেবেন না এটা করো ওটা করো না। আজকে যদি সে কোন ভুল করে তবে হয় ঘাড় ধাক্কা খাবে নয়তো এয়ার ফোর্সের পাইলটের সিটটা পাকা হয়ে যাবে। এতদিন ধরে শেখানোর পরও যদি কেউ ভুল করে তবে তার কোনও ক্ষমা নেই। আসলে ভুল হয়ে গেছে কথার কোন মানেই নেই এদের কাছে। আজ বিশ্বের আধুনিকতম বিমানটি সম্পূর্ণ প্রীতের কন্ট্রোলে থাকবে। সেখানে থাকবে শুধু প্রীত আর অটোপাইলট, অন্য আর কেউ নয়।


দুপুর বারোটার সময় এক এক করে নতুন প্রজন্মের পাইলটদের হাত ধরে ডানা মেলল যেন এক একটা অ্যালবাট্রস। আটখানা বিমান আকাশ সমুদ্র দাপিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল অজানার উদ্দেশ্যে। বেশ কিছুক্ষণ অন্তত আকাশে থাকতে হবে এখন ওদেরকে। প্রীত একটা নির্দিষ্ট দিক দেখিয়ে বলল, “ঐ দিকটায় আমরা কখনও যাই নি। স্যারকে বললেও স্যার রাজী হতেন না, চলো সকলে, আজকে যখন প্লেন আমাদের কন্ট্রোলে তখন আমরা আজকে ঐ নির্দিষ্ট দিকেই যাই।” রেডিও ফ্রিকোইয়েন্সি দিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। যুক্ত তারা গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকেও। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ এলো, “ঐ দিকে খুব বেশী দূর যাওয়া চলবে না। এখান থেকে ঐ নির্দিষ্টদিকে কিছুদূর গেলেই পড়বে “বারমুডা ট্রায়াঙ্গল”। ওটাকে সকলে শয়তানের ত্রিভুজ বলে থাকে। সারা বিশ্বের অনেক বিমান-জাহাজ ওখানে গিয়ে আর কখনও ফিরে আসে নি, তাই ঐ জায়গাকে আমরা অপয়া মানি। অথচ কেন এটা হয় অনেক তদন্ত চালিয়েও কোন কূল-কিনারা খুঁজে পাওয়া যাই নি। তোমরা যাচ্ছ যাও কিন্তু যে মুহূর্তে গ্রাউন্ড থেকে নির্দেশ পাবে সঙ্গে সঙ্গে উল্টোমুখে ফিরে আসবে।”


বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পরেই প্রীতের চোখে পড়ল সেই ত্রিভূজের মতো তিনটে দ্বীপ। সঙ্গে সঙ্গে গ্রাউন্ড থেকে নির্দেশ আসতে লাগল যে এবার তোমরা প্লেনের মুখ ঘোরাও অনেক এগিয়েছ আর নয়। সকলে দ্রুত প্লেনের মুখ ঘুরিয়ে নিল। এদিকে গুরপ্রীত যেন অমোঘ আকর্ষণে এগিয়ে চলতে লাগল সেদিকে। কি আছে ওখানে, এমন কি থাকতে পারে যেখানে সকলে হারিয়ে যায়। যারা হারিয়ে যায়, তারা কোথায় যায় ? এসব ছাই-পাশ ভাবতে ভাবতে তার প্লেনটা অনেক খানি এগিয়ে গিয়েছিল। ভাবল, এতোখানি এলাম আর ওর ওপর দিয়ে চক্কর কাটবে না তাও কি হয়? সে বেশ ভালো করে চক্কর কাটলো সেই তিন-দ্বীপ ওয়ালা ভয়াবহ আকাশের ওপর দিয়ে। সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। মনের এক অংশ বলছে একেই তো বলে জীবন উপভোগ করা, আজ যদি এই কারণে কিছু হয়েও যায় তবু মনে একটুও আপসোস থাকবে না আবার অন্য অংশটা এক অজানা বিপদের আশঙ্কায় কাঁটা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ও সফল হল নির্দিষ্ট দিকে প্লেনের মুখ ঘুরিয়ে নিতে। মনের মধ্যে থেকে এক অজানা ভয়ের মেঘ যেটা এতক্ষন ধরে চেপে বসেছিল সেটা মুহূর্তে কেটে গেল। তার এতো আনন্দ হল যেন সে এক অজানাকে জয় করেছে অচেনাকে চিনেছে। এই আনন্দে মশগুল হয়ে সোজা মেঘ চিরে আরও ওপরে আরও ওপরে উঠতে লাগল যেন সে তার সকল সতীর্থকে প্লেনের গায়ে লেগে থাকা এই অঞ্চলের মেঘের বাষ্প উপহার হিসাবে দিতে চায়। তারা যুদ্ধ-বিমানের চালক অথচ এই সামান্য সাহসটুকুও নেই।


__আমি ফিরে আসছি, আপনারা কোন চিন্তা করবেন না। আমি ফিরে আসছি।


                                                                                                                                             [পরের পাতায়]

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2015-2016 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.