বিজয়িনী


 

সাড়ে ছ’টা বাজতে আর ঠিক দু’মিনিট বাকি। রবীন্দ্র সদনের বিপরীতে অপেক্ষারত অঙ্গনা ব্যস্তভাবে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে প্রায় প্রতি মিনিটেই। যার আসার কথা ছিল সে এখনো এল না কেন? সন্ধ্যে ছ’টায় সময় দিয়ে কেউ যদি সাড়ে ছ’টাতেও এসে না পৌঁছোয়, তবে কি ধরে নেওয়া উচিত? সে আর আসবে না, তাইতো? হয়তো সে আসতে ইচ্ছুকই ছিল না কোনদিন। ভুলটা বোধহয় অঙ্গনারই, সদ্য বিলেতফেরত ইন্জিনিয়ার কেনই বা হঠাৎ বিয়ে করতে রাজি হবে তার মতো এক গরীব ঘরের মেয়েকে? মায়ের ইচ্ছের মর্যাদা রাখতে হয়তো সাময়িক সায় দিয়েছিল মাত্র। সরাসরি বলে দিলেই তো হতো, কি দরকার ছিল এমন ভণিতা করার? প্রথমবার দেখা করার প্ল্যানটা তো আদৌ অঙ্গনার ছিল না, সে তো জানে তার মতো অতি সাধারণ মেয়েদের স্বপ্ন দেখা বারণ, তবুও কেন এভাবে অপমানিত হতে হলো তাকে?

অঙ্গনার বাবা ছিলেন স্কুলটিচার। আক্ষরিক অর্থে ধনী না হলেও নিজের সংসারে কোনোদিন কোনো অভাব রাখতে দেননি তিনি। অঙ্গনার শৈশব কেটেছিল বেশ সুখেই। কিন্তু, সুখ কি কারোর চিরকাল থাকে? অঙ্গনার তখন মাত্র তেরো বছর বয়স, একটি রোড অ্যাক্সিডেন্টে তার বাবার একটি পা বাদ চলে যায়। তিনি মানসিকভাবেও অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। অকালেই শিক্ষকতা থেকে অবসার গ্রহণ করতে হয় তাঁকে। সংসারটা উপর যেন আস্ত একটা আকাশ ভেঙে পড়ে আচমকা। তবে, দুর্যোগকে সামাল দিলেন অঙ্গনার দাদা। কিন্তু, সে আর কতদিন? যেইমাত্র একদিন বিদেশ যাবার সুযোগ পেলেন, দেশ ছাড়লেন। প্রথম প্রথম অবশ্য ভালোই খোঁজখবর নিতেন বাবা-মায়ের, টাকা পাঠাতেন প্রতি মাসেই। কিন্তু, অদ্ভুতভাবেই সময়ের সাথে স্তিমিত হয়ে আসে সবটা। আজও ভেবে অবাক হয়ে যায় অঙ্গনা, একটা মানুষ কিভাবে এতটা বদলে যেতে পারে বিদেশে গিয়ে? বিদেশের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য , বিদেশিনী স্ত্রীকে পেয়ে স্বদেশে তার ভরসায় বেঁচে থাকা পরিবারের কথা কিভাবে ভুলে গেলেন তিনি? তবে, ভাবনায় চলে না জীবন। তাই, গ্র্যাজুয়েসনটা কোনো মতে পাস করেই অঙ্গনা চাকরির সন্ধানে পথে বেরোতে বাধ্য হয়। মা-বাবা ও ছোট বোনের মুখের দিকে চেয়ে ইউনিভার্সিটি’তে পড়ার স্বপ্নটা চিরতরে ত্যাগ করতে হয় তাকে। চাকরি অবশ্য সে পায়, এক পুরোনো বন্ধুর সাহায্যে, বড়সড় একটি কোম্পানিতে ছোটখাট একটি চাকরি। তবে, দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একরকম ভাবে। বিয়ে করবে না বলেই মনস্থির করে ফেলেছিল অঙ্গনা। বিয়ে করলে যে আর পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া যাবে না। কিন্তু, মাস কয়েক আগে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে হঠাৎই তাকে নিজের বিদেশ-ফেরত ছেলের জন্য পছন্দ হয়ে যায় এক ধনী ভদ্রমহিলার। বাবা-মা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। আজকে সেই সুপাত্র অর্জুনের সাথে তার প্রথমবার দেখা হওয়ার কথা। কিন্তু, সে তো এলোই না, যোগাযোগ পর্যন্ত করলো না একবার।

স্মৃতির সরণি বেয়ে অতীতে হারিয়ে গিয়েছিল অঙ্গনা, সংবিৎ ফিরলো সেলফোনটা বেজে ওঠার শব্দে। ফোনটা কানে ধরে সে বলে ওঠে,  "হ্যাঁ মা, অর্জুন তো এলো না। আর আসবে বলেও তো মনে হয় না। আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।" "এখুনি ফিরে এসো।", মায়ের গলার আওয়াজটা শুনে চমকে উঠলো সে। মা’কে এত গম্ভীর স্বরে কথা বলতে আগে কখোনো শোনেনি সে। একটা চাপা কান্নাও যেন লুকোনো ছিল তাতে। কিন্তু, কি হলো এমন? কোনো বিপদ নয়তো? ওপ্রান্ত থেকে ততক্ষণে লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে। অঙ্গনা উর্ধবশ্বাসে বাড়ির দিকে দৌড়ালো।

"তোর বসের সাথে কি বিশেষ সম্পর্ক আছে তোর?" মায়ের মুখে এই প্রশ্নটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায় অঙ্গনা, উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলে। "তোর প্রমোশনটা কি তবে ওই কারনেই হয়েছিল?" রেখাদেবী বলেই যান, "আমাদের সকলের মুখে এভাবে চুনকালি লেপে দিতে তোর এতটুকুও লজ্জা করলো না, তাই না? এই শিক্ষা দিয়ে বড়ো করেছি তোকে আমরা? এর চেয়ে তো তুই মরে গেলে আমরা ঢের বেশি সুখী হতাম রে, অন্তত তোর বাবার সম্মানটুকু তো বাঁচতো।" "তোমায় একথা কে বলেছে, মা?" মরমে মরে যেতে যেতে প্রশ্ন করে অঙ্গনা। "অর্জুনের মা তোর অফিসে গিয়েছিল আজ, তোর ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর নিতে, সেখানেই জানতে পেরেছেন এই ঘৃণ্য তথ্যটি। বাড়ি বয়ে এসে অপমান করে গেছেন, পাড়াপ্রতিবেশিদের সামনে তোর সম্মানের, তোর বাবার সম্মানের কিছুই অবশিষ্ট রাখেন নি। এবার শান্তি হয়েছে তো তোর?", রেখাদেবী কান্নায় ভেঙে পড়েন। অঙ্গনার কাছে এতক্ষণে অর্জুনের অনুপস্থিতির কারণটা স্পষ্ট হয়। হুইলচেয়ারে চুপচাপ বসে থাকা বাবার অসহায় দৃষ্টি তার হৃদয়টাকে যেন তছনছ করে দেয়। ছোট বোনের দৃষ্টিতেও যেন কেমন অদ্ভুত অবিশ্বাস। আর সহ্য করতে পারে না সে, দৌড়ে ঘরে ঢুকে গিয়ে দোর দেয়। অন্তরের জ্বালা, যন্ত্রনা, অপমান, লজ্জা সমস্ত কিছু অশ্রুরূপে উজাড় করে দেয় বালিশের বুকে।

 

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.